দূরে কোথাও একা ভ্রমণের আগে করনীয় বিষয় সম্বন্ধে জেনে নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ। লেখাপড়া, চাকুরী চিকিৎসা কিংবা প্রয়োজনীয় অনেক কাজেই একা বের হতে হয়। এটা ঠিক যে একা একা কাজ সম্পাদন করলে আত্মবিশ্বাস বাড়ে তবে এর সাথে ভয়ও থাকে। বিশেষ করে সেটি যদি হয় নতুন কোন স্থান কিংবা নতুন কোন অভিজ্ঞতা।
তাইতো তাদের জন্য আজকে একা ভ্রমণের কিছু পরামর্শ নিয়ে হাজির হয়েছে।
একা ভ্রমণে যাওয়ার আগে করণীয়
• প্রথমে গুগল ম্যাপ দেখে জায়গাটা সম্পর্কে ভালোভাবে জেনে নিন। উক্ত স্থানে কখন, কোথায় যাওয়া নিরাপদ এবং কোন জিনিসপত্র কখন বন্ধ হয়ে যায় তা আগে থেকে জেনে নিলে বাড়তি ঝামেলায় পড়ার সম্ভাবনা কম।
• প্রথমবার একা ভ্রমণের জন্য রিসোর্ট হতে পারে সবচাইতে উপযোগী স্থান। কারণ এখানে একই সাথে থাকা খাওয়ার সহজ সুবিধা পাওয়া যায়।
• মেয়ে মানুষ হলে অপরিচিত লোকের সাথে কথা বলা একদমই উচিত নয়।
• পরিচিত এবং বিশ্বস্ত হোটেলে উঠলে তাদের কাছ থেকে বিভিন্ন সময়ে নানা সহযোগিতা পাওয়া যায়।
• টাকা পয়সা সব একত্রে না রেখে কয়েকটি ভাগে ভাগ করে বিভিন্ন জায়গায় রাস্তা আছে। কারণ রাস্তাঘাটে চুরির ঘটনা আর হরহামেশাই ঘটে থাকে।
একা ভ্রমণের সুবিধা ও অসুবিধা
সঙ্গী ছাড়া একা ভ্রমণের সুবিধা এবং অসুবিধা দুইই রয়েছে।
সুবিধা
• নিজে নিজেই সব সিদ্ধান্ত নেয়া যায় এবং কোন ধরনের অসুবিধা হয় না।
• দেশ বা বিদেশে যেখানেই হোক না কেন দূরে গেলে বিভিন্ন ধরনের মানুষকে দেখার সুযোগ পাওয়া যায় তাই পর্যবেক্ষণও করা যায়।
• নতুন জায়গায় নতুন মানুষদের মাঝখান থেকে ভালো বন্ধু খুঁজে নিয়ে তাদের সংস্কৃতি এবং মনোভাব সম্পর্কে জানা যায়।
• অনেকেই নিজের স্বাধীনতা পছন্দ করে তাই একা ভ্রমণ করে। কারণ এই ক্ষেত্রে নিজের ইচ্ছাটাকেই বড় করে পালন করা যায়।
• ভ্রমণ মানেই যে শুধু জার্নি এবং সারাদিন ঘোরাফেরা তা নয়। অন্যতম সুবিধা হচ্ছে নিজে ইচ্ছামত হোটেল কক্ষে বসে বিশ্রাম নেওয়া যায়।
তাছাড়া ইচ্ছামত খাওয়া দাওয়া এবং চাপমুক্ত থাকা একা ভ্রমণের সুবিধাগুলোর মধ্যে অন্যতম।
অসুবিধা
• সবচাইতে বড় অসুবিধা হয় নিরাপত্তায়। কারণ কোন বিপদের পড়লে সহায়তার জন্য কাউকে পাশে পাওয়া যায় না।
• একা থাকলে হোটেল, রুম, ট্যাক্সি কিংবা বিভিন্ন জায়গায় খরচ কিছুটা বেশি হয়।
• প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বা দৃশ্য সাধারণত একা উপভোগ করলে তেমন আনন্দ পাওয়া যায় না।
• টিকেট কাটা, হোটেল বুকিং ইত্যাদি কাজ একা একাই সামলাতে হয়।
• ছবি তোলার জন্য সম্পূর্ণ অন্য মানুষের উপর নির্ভর করতে হয়।
• ভ্রমণের সময় হঠাৎ করে কোন অসুস্থ হলে কিংবা সমস্যা হলে একা একা সামান্য কষ্ট হয়ে পড়ে।
তাই একা ভ্রমণের ক্ষেত্রে অবশ্যই সকল ধরনের কাগজপত্র, প্রয়োজনীয় মেডিসিন ইত্যাদি সাথে থাকা প্রয়োজন।
মেয়েদের ভ্রমণের নিরাপত্তা টিপস
দূরে কোথাও একা একা ভ্রমণের ক্ষেত্রে মেয়েদের জন্য অবশ্যই প্রার্থী নিরাপত্তা অবলম্বন করা প্রয়োজন। বিশেষ করে সেটা যদি কয়েকদিনের জন্য ট্যুর হয়।
মেয়েদের নিরাপদে ভ্রমণের টিপস
• ঘুরতে যাওয়ার এলাকার নিরাপত্তা আইন এবং নারীদের থাকার জন্য উপযুক্ত স্থানগুলো সম্পর্কে আগে থেকে জেনে নিন।
• কাছাকাছি থাকা বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন আপনার পরিকল্পনা এবং স্থান সম্পর্কে নিয়মিত আপডেট দেন।
• স্থান অনুযায়ী রক্ষণশীল এবং উপযুক্ত পোশাক পরিধান করুন।
• জনবহুল কিংবা কেন্দ্রীয় এলাকায় হোটেল বুকিং দেন।
• হাঁটা থেকে বিরত থাকুন এবং বিশ্বাসযোগ্য যানবাহনে চলাফেরা করুন।
• অপরিচিত কারো সাথে কথা বলা কিংবা তাদের দেওয়া খাওয়া যাবেনা।
• নিজের সেফটির জন্য অ্যালার্ম, পেপার স্প্রে এবং পাওয়ার ব্যাংক সাথে রাখলে ভালো হয়।
তাছাড়াও পাসপোর্ট, জাতীয় পরিচয়পত্র, হোটেল বুকিং এর কাগজ ইত্যাদি সাথে রাখা ভালো। স্থানীয় পুলিশ কিংবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নম্বর রাখুন। যেকোনো ধরনের পরিস্থিতিতে দ্রুত সাহায্য চাইতে পারেন।
ব্যাকপ্যাকিং ট্যুর গাইড
অল্প খরচে এবং কম ব্যাগ নিয়ে স্বাধীনভাবে ভ্রমণ করার একটি পদ্ধতি হলো ব্যাকপ্যাকিং ট্যুর। এর জন্য প্রথমে পরিকল্পনা করুন এবং স্থান নির্ধারণ করুন। জায়গা নির্ধারণ করার পরে অবশ্যই দিন ও তারিখ ঠিক করে নিতে হবে। যেহেতু ব্যাকপ্যাকিং ট্যুর পাহাড়ি এলাকায় কিংবা দুর্গম এলাকায় কাঁধে করে নিয়ে যেতে হয় তাই নিজের ওজনের ২০ পার্সেন্টের বেশি ভাড়া নেওয়া উচিত নয়।
তারপর প্রয়োজনে কাগজপত্র খাবার ইত্যাদি সাথে নিয়ে বের হয়ে পড়ুন। ব্যাকপ্যাকিং ট্যুরের মূল উদ্দেশ্য হলো গণপরিবহন যেমন বাস, ট্রেন ব্যবহার করে ঘোরাঘুরি করা এবং পরিবেশ উপভোগ করা। বাংলাদেশের জন্য এর জনপ্রিয় স্থান হচ্ছে সুন্দরবন, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, সিলেট ইত্যাদি পাহাড়ি এলাকা। এ ধরনের ট্যুরের মাধ্যমে মূলত স্থান ও সংস্কৃতিক সম্পর্কে ভালোভাবে জানা যায়।
তাঁবু করে থাকার নিয়ম
অনেকেই রোমাঞ্চকর একটি অভিজ্ঞতা নেওয়ার জন্য কোলাহল থেকে দূরে গিয়ে প্রকৃতির মাঝে গিয়ে তাবু করে থাকা পছন্দ করেন। বাংলাদেশে এর প্রচলন কম হলেও পশ্চিমা দেশগুলোতে এর বেশ জনপ্রিয়তা রয়েছে। তবে দাবি করা থাকার ক্ষেত্রে অবশ্যই কিছু নিয়মাবলী অনুসরণ করা উচিত।
প্রথমত পানির উৎস থেকে কমপক্ষে ৫০ থেকে ১০০ মিটার দূরে তাবু পাতা প্রয়োজন। বৃষ্টির দিন হলে অবশ্যই রেইনফ্লাই ব্যবহার করতে হবে। যে স্থানে তাবুটি তৈরি করবেন সেখানে কোন উপকার আবাসস্থল কিংবা পিঁপড়া আছে কিনা যাচাই করে নিন। কোনভাবেই তাঁবুর ভেতরের রান্না করা যাবে না। এমনকি বাতাস চলাচলের জন্য পর্যাপ্ত জায়গা রাখ।
এই নিয়মগুলো মেনে চললে তাঁবু বাসের জন্য মোটামুটি নিরাপদ হবে।
ক্যাম্পিং করার সেরা জায়গা
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ক্যাম্পিং করার সেরা জায়গা গুলি হল বান্দরবানের পাহাড়, কক্সবাজারের সোনদ্বিয়া দ্বীপ, সেন্টমার্টিন, চট্টগ্রামের হাজারিখিল বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য, ঢাকার কাছে গাজীপুরের ভাওয়াল উদ্যান।
যদি হাতে বেশ কিছুদিন সময় থাকে তাহলে অবশ্যই চট্টগ্রাম, বান্দরবান কিংবা কক্সবাজার ক্যাম্পিং করার সেরা জায়গা। ঝড় বৃষ্টির দিনের ক্যাম্পিং না করাই ভালো। এক্ষেত্রে অবশ্যই শীতকাল বাংলাদেশের ক্ষেত্রে নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময় উপযোগী। জায়গা পছন্দ করার আগে অবশ্যই সেখানকার নিরাপত্তা এবং স্থানীয় আইন সম্পর্কে জেনে নেবেন।
নানান প্রয়োজনে কিংবা শখের হোক একা ভ্রমণের নিয়ম আমাদের সবে যা জানা প্রয়োজন। কারণ এটা যে শুধুমাত্র বিনোদন কিংবা ঘুরতে যাওয়ার জন্য প্রযোজ্য তা নয় বরং বিভিন্ন কাজের আমাদের সবাইকে কখনো না কখনো একা বের হতে হয়।