রাতে দেরিতে ঘুমানোর ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে জানা সত্ত্বেও অনেকেই এই অভ্যাসটি বদলাতে পারেননি। এতে একদিকে যেমন ঘুমের সমস্যা হচ্ছে অন্যদিকে মানসিক ও শারীরিক ক্ষতিসাধিত হচ্ছে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গিয়েছে যে সকল কিশোর বা তরুন তরুণীরা রাতে দেরিতে ঘুমাতে যায় এবং কম সময় ঘুমায় তাদের মস্তিষ্ক কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়ে। ঘুম ভালো হলে মাথার ব্রেইনও ভালো কাজ করে।
রাতে দেরিতে ঘুমানোর ক্ষতিকর ১৩ টা প্রভাব
১. হৃদরোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি: এই অভ্যাসটির কারণে খুবই অল্প বয়সেই উচ্চ রক্তচাপ এবং হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
২. ডায়াবেটিস: কম ঘুমের কারণে আমাদের দেহের শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণ ব্যাহত হয় এবং ডায়াবেটিস হতে পারে।
৩. ওজন বৃদ্ধি: শুধুমাত্র বেশি বেশি ঘুমালে মানুষ মোটা হয় এ ধরনের ভুল বরং অতিরিক্ত রাত জেগে থাকা স্থুলতা বা ওজন বৃদ্ধির কারণ।
৪. রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমা; কম ঘুমে মানুষের দেহের স্বাভাবিক প্রতিরক্ষা ব্যহত হয় এবং অল্পতেই দুর্বল হয়ে পড়ে, সাথে সাথে ঘন ঘন অসুস্থ হয়ে যায়।
৫. মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি: উদ্বেগ, বিষন্নতা এবং মানসিক চাপ বৃদ্ধি পায়।
৬. স্মৃতিশক্তি ও কর্মক্ষমতা হ্রাস: ধীরে ধীরে এই অভ্যাসটির কারণে চিন্তা করার ক্ষমতা এবং মনে রাখার ক্ষমতা কমতে শুরু করে।
৭. বিভিন্ন ধরনের ত্বকের সমস্যা: চোখের নিচে কালো দাগ পড়ার পাশাপাশি অকালে বলি রেখা দেখা দেয়।
৮. হরমোনের ভারসাম্যহীনতা: দেহের হরমোনের ভারসাম্যহীনতা দেখা যায় এবং খাবারের প্রতি অনিহা তৈরি হয়।
৯. ক্লান্তি অনুভব করা: অল্প পরিশ্রমেই হাপিয়ে যাওয়া কিংবা সারাদিন ঝিমুনি ও ক্লান্তি লাগতে পারে।
১০. তাছাড়া সারাদিনের আচরণে বেশ পরিবর্তন দেখা যায় এবং খিটখেটে মেজাজ হয়।
১১. দীর্ঘদিন এই অভ্যাসটি অব্যাহত থাকার কারণে হজমে সমস্যা দেখা দেয় এবং প্রায়ই পেটের সমস্যা হতে পারে।
১২. গবেষণায় দেখা গিয়েছে যারা কিনা দীর্ঘ সময় ধরে অনিয়মিত ঘুমের সমস্যায় ভুগছেন তাদের ক্যান্সারের ঝুঁকি বৃদ্ধি পাচ্ছে।
১৩. কম ঘুমের কারণে মাথা ব্যথা বা মাইগ্রেনের সমস্যা হতে পারে।
রাত জাগার ফলে শরীরের ক্ষতি
হার্ভাড মেডিকেল স্কুলের একটি গবেষণা দেখা গিয়েছে যে যারা কিনা রাতের বেলা দেরিতে ঘুমানোর অভ্যাস হয়েছে তাদের লেপটিন নামক হরমোনের উৎপাদন কমে যায়। এই হরমোনটির কাজ হচ্ছে ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণ করা। আবার ঘ্রেলিন নামক একটি হরমোন বৃদ্ধি পায় যা কিনা ক্ষুধা বৃদ্ধি করে। শরীরের হরমোনের এই পরিবর্তনের কারণে মানুষ বেশি খেতে শুরু করে এবং অতিরিক্ত ওজন বৃদ্ধি পায়।
তাছাড়া কম ঘুমের কারণে মনোবৈকাল্য, বিষণ্যতা, ফোকাসের সমস্যা, ত্বকের অবনতি এবং জীবনকাল হ্রাস পেতে পারে। আমরা ইতিমধ্যে জেনেছি যে এই অভ্যাসের কারণে ডায়াবেটিস, ক্যান্সার সহ অন্য অনেক ধরনের দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতা হতে পারে। তাই চিকিৎসকরা সতর্ক করেছেন স্বাস্থ্য সম্মত জীবন যাপনের জন্য অবশ্যই পরিমিত পরিমাণে ঘুম অপরিহার্য।
দেরিতে ঘুমানোর অভ্যাস ছাড়ার নিয়ম
রাতে ঘুমানোর ক্ষতিকর দিক জানার পর শুধুমাত্র দরকার প্রচন্ড ইচ্ছা শক্তি এই অভ্যাসটি ত্যাগ করার জন্য। আমেরিকান একাডেমিক অব স্লিপ মেডিসিনের তথ্য অনুসারে ১৩ থেকে ১৮ বছর বয়সে তরুন তরুণীদের প্রতি রাতে কমপক্ষে ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা ঘুমানো প্রয়োজন। প্রাপ্তবয়স্ক মানুষদের ক্ষেত্রেও দৈনিক সর্বনিম্ন ৬ থেকে ৭ ঘন্টা ঘুম জরুরী। এই অভ্যাসটি ছাড়ার জন্য নিম্নলিখিত পদক্ষেপ গুলো অনুসরণ করতে পারেন।
• কমপক্ষে ১ ঘন্টা আগে থেকে মোবাইল কিংবা ল্যাপটপ চালানো বাদ দিন।
• বিছানায় যাওয়ার কমপক্ষে ২ ঘন্টা আগে রাতের খাবার শেষ করুন।
• মোবাইল ফোন বিছানা থেকে দূরে রাখুন
• ঘুমানোর আগে হালকা শারীরিক ব্যায়াম করতে পারেন।
• এক গ্লাস গরম দুধ পান করতে পারেন এতে ঘুম ভালো হয়।
• রাত জেগে সিনেমা দেখার অভ্যাস ত্যাগ করুন
• সময় কাটার জন্য বই পড়তে পারেন।
• বিকালের পরে চা কিংবা কফি জাতীয় খাবার পরিহার করুন।
• ধূমপানের অভ্যাস থাকলে সেটা ত্যাগ করুন।
• অতিরিক্ত চিন্তা বাদ দিন।
ভালো ঘুমের জন্য রাতের রুটিন
ভালো ঘুমের জন্য রাতের রুটিনে কিছু সময় ব্যয় করা অবশ্যই বুদ্ধিমানের কাজ। প্রতিদিন একই সময়ে ঘুমানোর অভ্যাস করুন এবং সবার ঘর অন্ধকার ও শান্ত রাখার চেষ্টা করুন। অফিস থেকে ফিরে হালকা গরম জলে স্নান করলেও শরীর ঘুমের জন্য ভালো প্রস্তুত হয়।
ছুটির দিনগুলোতে ঘুমানোর আগে রুটিন গুলি ঠিক রাখুন। ভালো একটি রাতের জন্য অবশ্যই শোবার ঘর আরামদায়ক অন্ধকার এবং শান্ত হওয়া জরুরী। এক ঘন্টা আগে বই পড়ুন এবং হালকা মেডিটেশনও করতে পারেন। সেই সাথে বিছানা শুধুমাত্র ঘুমের জন্য ব্যবহার করুন এবং সেখানে বসে অন্য কাজ করবেন না।
insomnia সমস্যা সমাধান বাংলা
স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক কম ঘুমানোই মূলত ইনসোমনিয়া নামে পরিচিত। এই রোগীদের প্রচন্ড রকমের ঘুমের সমস্যা হয়। যদি শারীরিক কিংবা হরমোনের কোন সমস্যা না থাকে তাহলে উপরে উল্লেখিত রুটিন গুলো ফলো করলে অবশ্যই ভালো ঘুম হবে। তবে সেটিও যদি ঘুম যদি দীর্ঘস্থায়ী না হয় তাহলে অবশ্যই একজন চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া উচিত। কারণ এটি ভবিষ্যৎ অনেক বড় স্বাস্থ্যগত জটিলতার লক্ষণ হতে পারে।
“রাতে দেরিতে ঘুমানোর ক্ষতিকর ১৩ টা প্রভাব”-এ 1-টি মন্তব্য