বর্তমানে ডিজিটাল যুগে মোবাইল ফোনকে যারা নিত্য সঙ্গী হিসেবে বেছে নিয়েছেন তাদের অনেকেই এখন স্মার্টফোন ছাড়া এক মুহূর্ত থাকতে পারেন না। তবে সুস্থ থাকার জন্য অবশ্যই মোবাইল আসক্তি থেকে বের হওয়া প্রয়োজন। বিভিন্ন গবেষকদের প্রতিবেদনের আলোকে আজকে সেই স্মার্টফোন আসক্তি দূর করার কিছু বিষয় নিয়ে আলোচনা করব।
সারাদিন এই ডিভাইসের সাথে লেগে থাকা একদিকে যেমন স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর অন্যদিকে বিষন্নতা এবং মানসিক অবনতির জন্য দায়ী। তবে সহজ কিছু কৌশল অবলম্বন করলে এই ক্ষতিকর প্রভাব থেকে দূরে থাকতে পারবেন।
মোবাইল আসক্তি থেকে বের হওয়ার ১০ টি উপায়
১. স্মার্টফোন থেকে বিভিন্ন ধরনের অপ্রয়োজনীয় নোটিফিকেশন বন্ধ করুন। এতে করে অযথা মোবাইল হাতে নেওয়া কম হবে।
২. বিভিন্ন ধরনের সোশ্যাল মিডিয়া এবং বিনোদনের অ্যাপ কতক্ষণ ব্যবহার করবেন তার জন্য একটি সময় নির্ধারণ করুন।
৩. ঘুমানোর কয়েক ঘন্টা আগে মোবাইল দূরে রেখে দিন।
৪. চোখের সুরক্ষায় মোবাইলের গ্রেস্কেল মুড বা সুইচ অন করে রাখুন। এতে করে ডিভাইসের প্রতি আকর্ষণ কমে যায় এবং ব্যবহার কম হয়।
৫. সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাপ যেমন: ইনস্টাগ্রাম, টিকটক, ফেসবুকের মত অ্যাপ লুকিয়ে রাখুন। যাতে করে হোমস্ক্রিনে প্রবেশ করলেই এসব অ্যাপ চোখের সামনে না আসে।
৬. খুব বেশি জরুরী না হলে স্মার্টফোনটি চোখের আড়াল করে রাখুন। যখন প্রয়োজনীয় কল আসবে তখন রিংটোন তো বাজবে। আর অপ্রয়োজনীয় কথা বলাও বন্ধ করে দেন।
৭. তুলনামূলক ভাবে কঠিন লক সিস্টেম ব্যবহার করুন। এতে করে যখন তখন মোবাইল আনলক করাও কম হবে এবং ব্যবহার ও কম হবে।
৮. ফোনে ডিসপ্লে সেটিং থেকে ব্রাইটনেস এতটা সম্ভব কমিয়ে দিন। এতে করে চোখের উপকার হবে।
৯. যে সকল কাজ কম্পিউটারে করা সম্ভব সেগুলো মোবাইলে না করাই ভালো। এতে করে মোবাইলের প্রতি আসক্তি কিছুটা কমে যাবে।
১০. বাজার করা, দোকানে যাওয়া, নামাজ পড়তে যাওয়া ইত্যাদি অল্প সময়ের কাজে যখন বাইরে বের হবেন তখন স্মার্টফোন বাসায় রেখে যাবেন। এতে করে ধীরে ধীরে মোবাইল আসক্তি কমে যাবে।
সারাদিন মোবাইল ব্যবহার কমানোর কৌশল
হাতে থাকা স্মার্টফোনে যদি ইন্টারনেট সংযোগ থাকে তাহলে সেটি বেশিরভাগে ব্যবহার করে ইউটিউব এবং অযথা ভিডিও দেখে। আর যদি অলস সময় থাকে তাহলে তো কথাই নেই। সারাদিন কেটে যায় এসব রিলস স্ক্রোল করতে করতে।
সারাদিন মোবাইল ব্যবহার কমানোর কৌশলে আসলে আপনার ইচ্ছা শক্তির উপর নির্ভর করছে। যদি বেকার থাকেন কিংবা কোন চাকরি না থাকে তাহলে এমন কোন কাজ শুরু করুন যেটা একদিকে যেমন আপনার ক্যারিয়ারে উন্নতি করবে ঠিক এমনিভাবে মোবাইল থেকেও দূরে রাখবে। আর যদি একান্তই করার কিছু না থাকে তাহলে বই পড়ার অভ্যাস করুন। এতে করে মস্তিষ্ক উন্নত হবে এবং স্মার্টফোন আসক্তি ও দূর হবে।
মোবাইল আসক্তি থেকে বাঁচার উপায়
মোবাইল আসক্তি থেকে বাঁচার জন্য অবশ্যই বাস্তব জীবনে কিছু অভ্যাস পরিবর্তন করা দরকার। অবসর সময় গুলোতে ফোন ব্যবহারের পরিবর্তে এক্সারসাইজ করুন, শখের বিভিন্ন কাজ যেমন বাগান করতে পারেন অথবা পরিবার ও বন্ধুদের সাথে সরাসরি আড্ডা দিতে পারেন। এতে করে একদিকে যেমন সামাজিক বন্ধন রক্ষা হবে অপরদিকে মোবাইলের ক্ষতিকর প্রভাব হতেও দূরে থাকবেন। ফোন ছাড়া দিন কাটানোর অভ্যাস গড়ে তোলা আসলে আমাদের সবার জন্যই জরুরী।
ডিজিটাল ডিটক্স লাইফস্টাইল শুরু করার পদ্ধতি
ডিজিটাল ডিটক্স হলো সচেতনভাবে বিভিন্ন ধরনের ইলেকট্রনিক্স যেমন কম্পিউটার, মোবাইল, সোশ্যাল মিডিয়া ইত্যাদি ব্যবহার কমিয়ে বাস্তব জীবনের সাথে নিজের সংযোগ দিতে করা। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় সকাল থেকে ঘুম থেকে উঠে আমরা হাতের স্মার্টফোনটি নিয়ে নোটিফিকেশন এবং মেসেজগুলো চেক করি। কিংবা ফেসবুকে ঢুকে স্ক্রোল করতে থাকি।
যখনই আপনি সব সময় মোবাইল কিংবা ডিভাইস ব্যবহার না করে বাস্তবমুখী জীবনযাপন করবেন তখনই আপনি ডিজিটাল ডিটক্স লাইফস্টাইল শুরু করতে পারবেন। এ জীবন শুরু করার জন্য সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে ডিজিটাল বা ইলেকট্রনিক্স ডিভাইস ব্যবহার করার জন্য একটি নির্দিষ্ট সময় বরাদ্দ করা।
যেমন প্রথমেই ঘুম থেকে উঠেই ডিভাইস হাতে না নিয়ে আগে প্রয়োজনীয় কাজ সম্পন্ন করা। তারপর নির্দিষ্ট সময় নিয়ে মোবাইলে নোটিফিকেশন চেক করুন এবং জরুরি কাজ করুন। রাতের বেলা নিজেই নিজেকে কারফিউ দিন যে, রাত ৯ টা কিংবা ১০ টার পর আমি আর ডিভাইস ব্যবহার করব না। এভাবেই আপনি ধীরে ধীরে ডিজিটাল ডিটক্স লাইফ স্টাইল শুরু করতে পারবেন। সেই সাথে বন্ধুবান্ধব কিংবা আত্মীয়-স্বজন কেউ জানিয়ে দিন আপনাকে কোন সময় ফোনে কিংবা ইন্টারনেটে পাওয়া যাবে।
মোবাইল ছাড়তে না পারার মানসিক কারণ
স্মার্টফোন কিংবা মোবাইল ছাড়তে না পারার মানসিক কারণের সাথে আরো অনেক কারণ রয়েছে। এরমধ্যে রয়েছে ডোপামিন, একাকীত্ব, মানসিক চাপ ইত্যাদি। বিশেষ করে যারা একাকী জীবন যাপন করে তাদের মধ্যে হয় এই সকল আসক্তি সবচাইতে বেশি দেখা যায়।
আবার সোশ্যাল মিডিয়াতে বিভিন্ন ধরনের ভিডিও, ছবি, পোস্ট ইত্যাদি আমাদের ভেতরে একটি গুড ফিল কেমিক্যাল তৈরি করে যা এর প্রতি নেশা তৈরি করে।
অনেক সময় মোবাইল দূরে রাখলে মনে হয় সমাজ থেকে আমি বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছি। তখন আর চেষ্টা করেও হাত থেকে মোবাইল রাখা যায় না বরং আরো কঠিন হয়ে পড়ে।
আবার দীর্ঘদিন ব্যবহারের ফলে ফোনটি একটু স্বয়ংক্রিয় অভ্যাসে পরিণত হয় যা কিনা মোবাইল ছাড়তে না পারার মানুষের কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম। তাই এ সকল অভ্যাস থেকে বের হয়ে ডিজিটাল ডিটক্স লাইফস্টাইলে প্রবেশ করা খুবই জরুরী।
তথ্য প্রযুক্তির এই যুগে একটি স্মার্টফোন আমাদের কাছে অনেক বেশি সহজ করে দিয়েছে। এর মাধ্যমে আমরা দৈনন্দিন জীবনে নানা ধরনের সুবিধা ভোগ করে থাকে এবং দেশ-বিদেশে যোগাযোগ রক্ষা করতে পারে। তবে এর অতিরিক্ত ব্যবহার অর্থাৎ মোবাইল আসক্তি কখনোই কাম্য নয়। বিশেষ করে উঠতি বয়সী তরুন তরুনী কিংবা শিশুদের হাতে মোবাইল আরো বেশি ক্ষতিকর। তাই এর জন্য সামাজিক সচেতনতা ও জরুরী। আপনার বন্ধুদের সাথে এই আর্টিকেলটি শেয়ার করে তাদের মাঝেও সচেতনতা বৃদ্ধি করতে সহায়তা করুন।
“মোবাইল আসক্তি থেকে বের হওয়ার ১০ টি উপায়”-এ 1-টি মন্তব্য