একজন মানুষের অনেক ধরনের গুণ থাকতে। সুন্দর করে কথা বলতে পারাটা এর মধ্যে অন্যতম। অনেকেই মানুষের সামনে কথা বলার জড়তা কাটানোর উপায় সম্পর্কে জানতে চান। কিছুসংখ্যক মানুষের সমাগমে কিংবা অফিসের মিটিং এ কথা বলার জড়তাকে ইংরেজিতে গ্লোসোফোবিয়া বলা হয়। এর সমাধানের জন্য প্রয়োজন নিয়মিত অনুশীলন এবং নিজের প্রতি আত্মবিশ্বাস। মানুষের জীবনের যেকোনো পর্যায়ে সুন্দর করে এবং বুঝে কথা বলতে পারাটা খুবই জরুরী।
কথা বলার জড়তা কাটানোর কার্যকর উপায়
১. অনুশীলন করা
প্রতিদিন ১০ থেকে ১৫ মিনিট আয়নার সামনে অথবা ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে নিজে নিজে কথা বলার অভ্যাস করুন। এতে করে মুখের এক্সপ্রেশন বুঝতে পারবেন এবং জড়তাও দূর হবে। ভিডিও করে পরবর্তীতে সেটি বারবার দেখলে ভূল সহজে ধরা যায়।
২. বাস্তব অনুশীলন
যদি বড় কোনো জনসমাগমে কথা বলার সাহস না থাকে তাহলে পরিচিত বা অল্প পরিচিত ছোট ছোট লোকসমাগমের কথা বলা শুরু করুন। পরিবারের কোনো আড্ডায় বন্ধুদের মিটিং এ কিংবা সমাজের কোন আয়োজনে চেষ্টা করুন কিছু বলার। ধীরে ধীরে আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি পেলে বড় জন সমাগমে সাহস নিয়ে দাঁড়িয়ে পরুন।
৩. পূর্ব প্রস্তুতি
যেকোনো কাজের জন্যই আগে থেকে প্রস্তুতি নিলে সেটির প্রতি আমাদের আত্মবিশ্বাস বেশি থাকে। তাই সামনে কোন মিটিং অথবা অনুষ্ঠান থাকলে সেই লক্ষ্যে একটি স্পিচ রেডি করুন এবং বাসায় কয়েকবার প্র্যাকটিস করুন। এটি খুবই কার্যকরী।
৪. বিরতি নেওয়া
স্টেজে উঠে কিংবা কিছু সংখ্যক লোকের মাঝে দাঁড়িয়েছে একটানা কথা বলতেই থাকতে হবে এরকম কোন বিষয় নয়। কথা বলতে বলতে মাঝে মাঝে দীর্ঘ শ্বাস নিন অথবা সামান্য একটু সময়ের জন্য বিরতি নিন।
৫. আত্মবিশ্বাস
আমি পারবো এই মানসিকতা টা তৈরি করুন। ভুল হলে ভেঙ্গে পড়বেন না বরং মনে মনে ভাবুন এতে কোন সমস্যা নেই। পরবর্তীতে যেন এই ভুল না হয় সেদিকে খেয়াল রাখুন।
সুন্দর করে কথা বলার জন্য ভালো ভালো বক্তাদের ভিডিও দেখুন এবং তাদের অঙ্গভঙ্গি খেয়াল করতে পারেন। একই সাথে যে ভাষায় বক্তৃতা দেবেন সে ভাষায় উচ্চারণ গুলো শুদ্ধ হওয়া জরুরী। এতে কথা শুনতে অনেক বেশি ভালো শোনায় এবং আপনার ব্যাক্তিত্ব প্রকাশ পায়।
সুন্দর করে কথা বলার কৌশল
যোগাযোগের প্রধান এবং অন্যতম ভাষা হচ্ছে কথা যা আমরা সবাই ব্যবহার করে থাকি। এটি একটি শিল্প তা হয়তোবা অনেকেই খেয়াল করি না। যারা সুন্দর ভাবে কথা বলতে পারে তাদের কথা সবাই মনোযোগ দিয়ে শুনতে চায়। চেষ্টা করলে আপনিও এটি পারবেন যদি নিচের টিপস অনুসরণ করুন।
• শব্দের উচ্চারণ হতে হবে শুদ্ধ। অফিস কিংবা কর্পোরেট পরিবেশে অবশ্যই আঞ্চলিকতা পরিহার করবেন। অন্যান্য পরিবেশে চেষ্টা করবেন শুদ্ধ বাংলা ভাষা বলার জন্য।
• কোন বিষয়ে সুন্দরভাবে কথা বলতে চাইলে সেই বিষয়ে পূর্ব থেকে যথাযথ জ্ঞান থাকা জরুরী। এক্ষেত্রে ইন্টারনেট কিংবা বিভিন্ন বই পেরে তথ্য জেনে নিতে পারেন। সেই সাথে অপ্রয়োজনীয় এবং নেতিবাচক কথা বলা থেকে বিরত থাকুন।
• তারপর কারো কারো মুদ্রা দোষ থাকে। একই কথা বারবার বলা, কথার মাঝে তোতলানো ইত্যাদি অভ্যাস থাকলে তা দ্রুত পরিহার করুন।
• মানুষের কাছে নিজের কথা সৌন্দর্য প্রকাশ করার একটি অন্যতম উপায় হচ্ছে আন্তরিকতা প্রকাশ করা। কথা বলার শুরুতে এবং শেষে এই আন্তরিকতা ও শ্রদ্ধাজ্ঞাপন আপনার উন্নত ব্যক্তিত্বের প্রকাশ ঘটায়। এভাবেই আপনি সুন্দরভাবে কথা বলার কৌশল গুলো অবলম্বন শিখতে পারেন।
লজ্জা কাটানোর উপায়
লজ্জা নেই এমন অনুভূতি সম্পন্ন মানুষ পাওয়া বেশ কঠিন। কারণে-অকারণে বিভিন্ন পরিস্থিতিতে আমরা লজ্জিত হই মাঝে মাঝেই। তবে কোন কারণ ছাড়াই যারা সবসময়ই লজ্জা পান সেটি কাটিয়ে ওঠার জন্য চেষ্টা করাই উচিত।
এ যেমন ধরুন, অপরিচিত কারো সাথে কথা বলতে গেলে, বাইরে চলাফেরা করতে এমনকি লোকের সামনে খেতে বসতেও অনেকে লজ্জা পান।
শুধুমাত্র এই একটি অভ্যাস জীবনের অনেক অসুবিধে তৈরি করতে পারে। এমনকি অনেক সুযোগ হারিয়ে যেতে পারে অথবা ক্যারিয়ার দুর্বল হতে পারে। কারণ সব জায়গায় সফল তারাই হয় যারা আত্মবিশ্বাসে থাকেন।
লজ্জা কাটানোর উপায় গুলো কি কি
• নিজেকে দক্ষ ভাবে গড়ে তুলুন
• কথা উপস্থাপন করার জন্য শব্দ শিখুন
• বই পড়ুন কিংবা প্রয়োজনীয় সব বিষয়ে গবেষণা করে জ্ঞানের পরিধি বৃদ্ধি করুন।
• সবসময় পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন পোশাক পরিধান করুন।
• চুল কিংবা দাড়ি সহ শরীরের যত্ন নিন।
• নিয়মিত ব্যায়াম করুন
• পুষ্টিকর খাবার খান এবং মস্তিষ্কের যত্ন নিন
• নতুন নতুন মানুষের সাথে পরিচয় হওয়ার চেষ্টা করুন
• মানুষকে বলল সেটা গায়ে মানবেন না
উপরে তো পয়েন্টগুলো কাটিয়ে উঠতে পারলে আশা করি লজ্জা কাটাতে পারবেন।
উপস্থাপনা বা প্রেজেন্টেশন দেওয়ার নিয়ম
ইউনিভার্সিটিতে কিংবা অফিসে অন্যতম একটি প্রয়োজনীয় অংশ হচ্ছে প্রেজেন্টেশন দেওয়া। এটি দক্ষতার জন্য খুবই প্রয়োজনীয় অংশ। স্থান, কাল, পাত্র ভেদে প্রেজেন্টেশনের বিষয়বস্তু ভিন্ন হলেও ধরন একই রকমের।
একটি প্রেজেন্টেশন কে কিভাবে সুন্দর এবং অধিক গ্রহণযোগ্য করা যায় সে বিষয়গুলো মাথায় রেখে আমি নিচে কয়েকটি পয়েন্ট আলোচনা করছি।
১. সবসময় চেষ্টা করবেন একটি স্লাইডে একটি পয়েন্ট নিয়ে আলোচনা করার। ধরুন এই প্রেজেন্টেশনে সর্বমোট ১০ টি পয়েন্ট নিয়ে আলোচনা করবেন। তাহলে মোট দশটি স্লাইড তৈরি করুন। এতে করে শ্রোতার মনোযোগ ভালো থাকে।
২. নিজে কখনোই স্লাইডের দিকে তাকাবেন না। এতে করে শ্রোতা বিরক্ত বোধ করতে পারে। এমনকি উপস্থাপনকারীর আত্মবিশ্বাসহীনতার প্রকাশ পায়।
৩. একই কথা বারবার বললে সেটি এগিয়ে শোনা যেতে পারে। তাই স্পিচ আগে থেকেই গুছিয়ে নিন।
৪. প্রেজেন্টেশন ফাইলের ফন্ট সাইজ এবং টাইপ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যথাসম্ভব প্রফেশনাল এবং মিডিয়াম সাইজের ফন্ট ব্যবহার করুন। একইভাবে গাঢ় কিংবা লাল, নীল কোনো রং ব্যবহার না করাই ভালো। নীল, ধূসর, কালো ইত্যাদি কর্পোরেট টাইপের রং ব্যবহার করুন।
৫. যেহেতু স্টেজে দাঁড়িয়ে কথা বলতে হয় তাই অতিরিক্ত গল্প কিংবা ইনফরমেশন প্রদান করা উচিত নয়। সুন্দর প্রেজেন্টেশন দেওয়ার জন্য শুধুমাত্র প্রাসঙ্গিক বিষয়ের উপরে কথা বলুন।
৬. যেহেতু স্টেজে কিংবা অফিসের অন্যান্য স্টাফদের সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলতে হয় তাই ড্রেস কোড মেনে চলুন। সেই সাথে এমন ভাবে কথা বলুন যাদের সামনে থেকে পেছনে সকল লোকের সমান ভাবে কথাগুলো শুনতে পায়।
তোতলামি দূর করার ঘরোয়া সমাধান
গবেষকদের মতে কথা বলার সময় তোতলানো একটি জন্মগত ত্রুটি। অনেকেই মনে করে থাকেন মুখে পয়সা দিলে হয়তোবা এটা ভালো হয়ে যায়, তবে এর বৈজ্ঞানিক কোনো ব্যাখ্যা নেই। এক্ষেত্রে মানুষ মনে করে মুখে পয়সা ঢুকিয়ে মুখের রাখলে ব্যায়াম হয় এবং বেশি শীতল হয়। তবে বিজ্ঞান বলে এই পদ্ধতি আসলে তেমন কোন কাজের নয়।
চিকিৎসকরা পরামর্শ দেন তোতলামো দূর করার জন্য চোয়াল, ঠোঁট, জিহ্বা, গাল এগুলোর ব্যায়াম। মুখ হাঁ করলে চোয়ালের ব্যায়াম হয়। আবার জিহব্বা পেছনদিকে উল্টো করে আবার সামনে আনলে জিহব্বার ব্যায়াম হয়।
দৈনিক কিছু সময় ধরে এভাবে ব্যায়াম করলে তোতলামি দূর হয়ে যেতে পারে। বিজ্ঞানী আইজ্যাক নিউটন, বিশ্ব বিখ্যাত দার্শনিক এরিস্টটল সহ অনেক গুণী ব্যক্তিদেরই এ ধরনের সমস্যা ছিল। তবুও তারা এই নিয়ে ভালোভাবে জীবন যাপন করেছেন এবং পৃথিবীর মানুষের জন্য অবদান রেখে গেছেন। তাই ঘরে শিশুর এধরনের লক্ষণ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন কিন্তু কোনভাবেই বকাঝকা অথবা দোষ দেওয়া উচিত নয়। এক্ষেত্রে মানসিক সাপোর্টের সবচাইতে বেশি জরুরী।
আজকের এই লেখাটির মাধ্যমে আমি চেষ্টা করেছি মানুষের সামনে কথা বলার জড়তা কাটানো, সুন্দর প্রেজেন্টেশন দেওয়ার নিয়ম ও তোতলামি দূর করার ঘরোয়া সমাধান সম্পর্কে। আশা করি আপনার কিংবা পরিবারের কারো সমস্যা সমাধানে এই লেখাটি কাজে আসবে। এ ধরনের আরো লেখা পেতে আমাদের ওয়েবসাইটের সাথে থাকুন।