মেঘের রাজ্য সাজেক ভ্যালি ভ্রমণের বিস্তারিত গাইডলাইন ও খরচ

ভ্রমণ পিপাসু মানুষদের কাছে অন্যতম প্রিয় একটি স্থান হচ্ছে সাজেক ভ্যালি। এটি অবস্থিত রাঙ্গামাটি জেলার বাঘাইছড়ি উপজেলায়। এমনকি বাংলাদেশের সবচাইতে বড় ইউনিয়ন হিসেবে পরিচিত এটি। সাজেক ভ্রমণের ইচ্ছে নেই এমন মানুষ খুব কমই রয়েছে। তাদের জন্যই আজকের এই আলোচনাটি।

সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১৮০০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত এই স্থানটিতে রয়েছে মনোরম পাহাড় সাদা আর তুলোর মত মেঘ। আশ্চর্যজনক এই জায়গা থেকে একই দিনে প্রকৃতির ভিন্ন ভিন্ন রূপ দেখা যায়। কখনো খুব গরম আবার একটু পরে হঠাৎ করেই বৃষ্টি, কিছুক্ষণ পর চোখের পলকে চারিদিক ঘন কুয়াশার চাদরে ঢেকে যায়। আর পাহাড়ের উপর থেকে মেঘেদের বেয়ে চলা দেখার জন্য আদর্শ জায়গা হচ্ছে সাজেক। তাছাড়া আশেপাশে সুন্দর পাহাড়ি গ্রাম এবং ভারতের লুসাই পাহাড়ও এখান থেকে দৃশ্যমান হয়।

সাজেক রিসোর্ট ভাড়া তালিকা

যেকোনো স্থানে ভ্রমণ করার আগে সেখানকার যাবতীয় খরচ এবং নিয়ম সম্পর্কে আগে থেকে জানা প্রয়োজন। এতে করে বাজেট নির্ধারণ করার সহজ হয় এবং পরবর্তীতে কোন বিড়াম্বনায় পড়তে হয় না। থাকার জন্য যারা রিসোর্ট পছন্দ করেন তাদের জন্য সেখানকার খরচের একটি তুলনামূলক তালিকা উল্লেখ করা হলো।

সাজেকের মোটামুটি সুখ পরিচিত রিসোর্ট গুলোতে এক রুম ভাড়া পড়বে ২৫০০ থেকে ৩৫০০ টাকার মত। তবে ছুটির দিন ছাড়া এই রুমগুলোই ২০০০ থেকে ২৫০০ টাকার মধ্যে পাওয়া যায়। যারা কিনা ডাবল বেড রুম নিতে চান তাদের জন্য ভাড়া ৫০০ থেকে ১০০০ টাকা বেশি হতে পারে। আবার সিঙ্গেল বেড রুমের জন্য কিছু টাকা অতিরিক্ত দিলে সেখানে আরো একটি বেড এক্সট্রা পাওয়া যায়।

যারা একটু কম খরচে থাকতে চান তাদের জন্য মেঘের ঘর রিসোর্ট হতে পারে ভালো চয়েজ। এই রিসোর্ট টিতে মোট ৮ টি রুম রয়েছে এবং প্রতিটি রুমের জন্য ভাড়া করে ৬০০ থেকে ১২০০ টাকার মধ্যে। তাছাড়া পাহাড়িকা রিসোর্টে ১০০০ থেকে ১৫০০ টাকার মধ্যেও রুম ভাড়া নেওয়া যায়।

আবার যারা একটু পাহাড়ে মানুষদের মত জীবন যাপন করতে চান তারা আদিবাসী ঘর ভাড়া নিতে পারেন। জনপ্রতি ১৫০ থেকে ৩০০ টাকা ভাড়া হতে পারে তবে ফ্যামিলি নিয়ে কখনো এখানে থাকা উচিত নয়।

সাজেকে রিসোর্ট ভাড়া করার ক্ষেত্রে অবশ্যই যাত্রা শুরু করার আগে ফোন দিয়ে বুকিং কনফার্ম করা প্রয়োজন। তা না হলে সেখানে গিয়ে রুম না পেলে করতে পারেন অসুবিধায়।

ঢাকা থেকে সাজেক যাওয়ার উপায়

যারা ঢাকা থেকে সাজেক যাওয়ার চিন্তা-ভাবনা করছেন তাদের জন্য আগে থেকেই রাস্তাঘাটের গাইডলাইন যারা জরুরী। ঢাকা থেকে প্রথমে খাগড়াছড়ি যেতে হবে। হানিফ এন্টারপ্রাইজ, সৌদিয়া, সেন্টমার্টিন হুন্দাই, দেশ ট্রাভেলস, এস আলম, ঈগল ইত্যাদি বাসে করে যাওয়া যায়। এসব বাসে ভাড়া পড়বে ৭৫০ টাকা থেকে ৯০০ টাকা পর্যন্ত। আর এসি বাসে যেতে চাইলে ভাড়া পূর্বে এক হাজার টাকা থেকে ১৫০০ টাকার মধ্যে।

ঢাকা থেকে সাধারণত রাত ১০ টায় খাগড়াছড়ি উদ্দেশ্যে এই বাসগুলো ছেড়ে যায়। খাগড়াছড়ি থেকে সাজেকের যেতে প্রায় ৬৫ কিলোমিটার দূরত্ব অতিক্রম করতে হয়। খাগড়াছড়ি শহরের শাপলা চত্বর থেকে জিপ গাড়ি চাঁন্দের গাড়ি ইত্যাদি রিজার্ভ নিয়োগ পেলে যাওয়া যায়। আবার রিজার্ভ সিএনজি ভাড়া নিলে ৪০০০ টাকা থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ হয়। যেহেতু পাহাড়ি উঁচু-নিচু রাস্তা তাই সিএনজিতে ভ্রমণ না করাই ভালো।

আবার ঢাকা থেকে খাগড়াছড়ি জেলার দীঘিনালাতে সরাসরি কিছু বাস রয়েছে। এই বাসের মাধ্যমে দীঘিনালা থেকে পরবর্তীতে সাজেক যাওয়া যায়।

সাজেক ভ্রমণের মোট খরচ

অনুষ্ঠানে ভ্রমণের খরচ সম্পূর্ণ নির্ভর করে ব্যক্তিগত পরিকল্পনার উপর। যাতায়াত খরচ বাদে সেখানকার থাকা, খাওয়া, কেনাকাটা, ঘোরাফেরা কতদিন থাকবেন ইত্যাদি বিষয় বিবেচনা করে সাজে ভ্রমণের মোট খরচ নির্ধারিত হয়।

তার ওপর একা গেলে মোটামুটি ১০ হাজার টাকায় যাওয়া থাকা, খাওয়া, কিছু কেনাকাটা এবং বিভিন্ন স্পটে ভ্রমণে ভালোভাবেই হয়ে যায়। তবে কাপল কিংবা পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের কে নিয়ে গেলে খরচের পরিমাণ আরো বাড়তে পারে।

খাগড়াছড়ি দর্শনীয় স্থান

বাংলাদেশের অন্যতম একটি পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়িতে বেশ কয়েকটি দর্শনীয় এবং মনোমুগ্ধকর স্থান রয়েছে। সেগুলো হলো:

• পাহাড়ে চূড়ায় অবস্থিত প্রায় ৩০০ ফুট দীর্ঘ এবং অন্ধকারাচ্ছন্ন আলুটিলা প্রাকৃতিক গুহাটি সব পর্যটকদের কেই টানে।
• খাগড়াছড়ি শহরের কাছে রয়েছে ঝুলন্ত ব্রিজ এবং জেলা পরিষদ পার্ক।
• আলু টিলার কাছে রয়েছে অন্যতম একটি নান্দনিক স্থান রিছাং ঝরনা।
• পানছড়ি উপজেলা রয়েছে একটি শান্ত পরিবেশের সাথে বৌদ্ধ মন্দির।

সাজেক ভ্যালি ছাড়াও হাজা চোরা ঝর্ণা এবং হেরিটেজ পার্ক ভ্রমণের জন্য বেশ ভালো জায়গা।

সাজেক ভ্যালি ট্যুর প্যাকেজ

বর্তমানে ফেসবুক এবং ইন্টারনেটের কল্যাণে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান সাজেক ভ্যালি টুর প্যাকেজের বিজ্ঞাপন দিয়ে থাকে। এ ধরনের টুর প্যাকেজের প্রধান সুবিধা হচ্ছে নিজে থেকে তেমন কিছু করতে হয় না। প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে যাতায়াতসহ নানা ধরনের ফ্যাসিলিটি দেওয়া হয়ে থাকে।

কি কি সুবিধা থাকে এ ট্যুর প্যাকেজ

• সিঙ্গেল, কাপল বা ফ্যামিলি সদস্য সংখ্যা ভেদে বিভিন্ন ধরনের প্যাকেজ।
• সব ধরনের যাতায়াত সুবিধা
• প্যাকেজ অনুযায়ী থাকা এবং খাওয়ার সুবিধা
• বিভিন্ন জায়গায় ঘোরার জন্য চান্দের গাড়ি
• সাজেক এবং বিভিন্ন স্পটে ঢোকার টিকেট

পর্যটন এজেন্সি গুলোর প্যাকেজের ভেতরে কোন কোন প্রতিষ্ঠান ঔষধ, চাইল্ড পলিসি ইত্যাদিও অন্তর্ভুক্ত করে থাকে। আবার শুধুমাত্র নির্দিষ্ট সময় ভিত্তিতে যাওয়া এবং আসার ট্যুর প্যাকেজও পাওয়া যায়। তাই নিজের পরিকল্পনা এবং চাহিদা অনুযায়ী ইচ্ছামত সাবজেক্ট ট্যুর প্যাকেজ পছন্দ করতে পারবেন। এক্ষেত্রে অবশ্যই নিরাপত্তা এবং বিশ্বস্ততা সবার আগে বিবেচনা করতে হবে। জনপ্রিয় এবং বিশ্বস্ত এমন কোন এজেন্সি থেকে ট্যুর প্যাকেজ নেওয়া উচিত।

সাজেক ভ্রমণের অন্যান্য টিপস

• এই স্থানটিতে সব ধরনের অপারেটরের নেটওয়ার্ক নাও পেতে পারেন। তাই কয়েকটি অপারেটরের সিম সাথে রাখুন।
• এখানে বিদ্যুৎ নেই তাই একটি পাওয়ার ব্যাংক সাথে রাখা ভালো।
• কখনোই জিপের ছাদে ওঠা উচিত নয়।
• কোন আদিবাসী ছবি তোলার আগে তার অনুমতি নিয়ে নেই।
• পাহাড়ে সংস্কৃতির প্রতি সম্মান দেখান।
• যেখানে সেখানে ময়লা ফেলবেন না।

ব্যক্তিগতভাবে গেলে অবশ্যই উপরের দেওয়া সাজেক ভ্রমণের টিপসগুলি খেয়াল রাখবেন। আর ট্রাভেল এজেন্সির সাথে ভ্রমন করলে তাদের সকল নিয়ম-কানুন অনুসরণ করার চেষ্টা করবেন এবং যে কোন ধরনের সমস্যায় তাদেরকে অবহিত করবেন। আশা করি ঢাকা থেকে সাজেক যাওয়ার এবং সেখানকার সকল তথ্য সম্পর্কে আপনাদেরকে কিছুটা জানাতে পেরেছি। সবার জন্য শুভকামনা।

মন্তব্য করুন