বিনোদনের জন্য দেশ-বিদেশে ভ্রমণের বিকল্প আর কোন কিছু হয় না। কিন্তু বিপত্তি তখনই বাধা যখন পকেটের সাথে শখের সামঞ্জস্য হয় না। সবারই ধারণা কোথাও ঘুরতে যাওয়ার জন্য বেশ অর্থের প্রয়োজন। কথাটি সত্যি হলেও আজকে আমি কম খরচে ভ্রমণ করার কিছু দারুন কৌশল আলোচনা করব।
কম খরচে ভ্রমণ করার টিপস ও ট্রিকস
দলগত ভ্রমণ
একসাথে অনেক জন কোথাও ঘুরতে গেলে আনন্দ যেমন বৃদ্ধি পায় ঠিক তেমনিভাবেও বাড়তি নিরাপত্তাও পাওয়া যায়। আর হচ্ছে সবচাইতে বড় সুবিধা হচ্ছে জনপ্রতি ভাড়া কিংবা বেশ খরচ কমে আসে।
অফ সিজনে ভ্রমণ
পিক সিজনে ঘুরতে গেলে অন্যান্য সময় থেকে বেশি খরচ হয়। তাই অফ সিজনে পর্যটকদের চাপ কম থাকে এবং ব্যক্তিগত ছুটিকে কাজে লাগিয়ে কম টাকায় ঘুরে আসা যায়।
নিজে নিজে কাজ করা
থার্ড পার্টি কোন এজেন্সির মাধ্যমে সব বুকিং না দিয়ে নিজে নিজে বাস ট্রেনের টিকেট কিংবা হোটেল বুকিং দিন। এতে করে এজেন্সি গুলোর কমিশনের খরচ বেঁচে যাবে এবং নিজে দরদাম করলে বেশ সাশ্রয়ী হবে।
যাতায়াত মাধ্যম
ব্যক্তিগত গাড়ি ভাড়া না করে পাবলিক ট্রান্সপোর্ট ব্যবহার করা কম খরচে ভ্রমণ করার অন্যতম উপায়। লোকাল বাস কিংবা রিক্সা প্রাইভেট ট্যাক্সি বা প্রাইভেটকার এর চাইতে অনেক বেশি সস্তা।
প্ল্যান করুন
যেখানে যেতে ইচ্ছুক সে জায়গা সম্পর্কে আগে থেকে পড়াশোনা করুন এবং সুনির্দিষ্ট একটি পরিকল্পনা তৈরি করুন। যদি দেশের বাইরে ঘুরতে যান তাহলে এমন একটি সময় নির্বাচন করতে হবে যখন ট্রেনের টিকেটের দাম সবচাইতে কম থাকে।
শুকনো খাবার ও পানি
পাহাড়ে কিংবা দুর্গম এলাকায় অবশ্যই এই ধরনের খাবারের দাম তুলনামূলকভাবে বেশি থাকে। তাই আগে থেকেই সাথে করে পানি এবং শুকনো খাবার নিয়ে যান। এখানে অনেক খরচ কমে যাবে।
অতিরিক্ত কেনাকাটা বন্ধ করুন
নতুন কোন জায়গায় গেলে সেখানকার নতুন নতুন জিনিস থেকে অনেক কিছুই কিনতে মন চায়। কিন্তু এই অপ্রয়োজনীয় কেনাকাটা খরচ বাড়িয়ে দিতে পারে। তাই সত্যিই প্রয়োজন না থাকলে কেনাকাটা বন্ধ করুন। আর কিছু কেনার জন্য নির্দিষ্ট বাজেট আগে থেকেই করে নিন এবং তার অতিরিক্ত করার চেষ্টা করবেন না।
কম খরচে দার্জিলিং ভ্রমণ
যারা কিনা কম খরচে দেশের বাইরে ঘুরতে যেতে চান তাদের জন্য একটি ভালো অপশন হলো দার্জিলিং। ভ্রমণকারীদের জন্য এটির আলাদা একটি কদর রয়েছে যা আমাদের সবারই জানা। চলুন এবার অল্প টাকায় কিভাবে দার্জিলিং থেকে ঘুরে আসতে পারেন তার জেনে নেই।
শুরুতেই বলে নেই এই স্থানটি সম্পর্কে মোটামুটি সবারই ধারণা আছে। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের অবস্থিত এই শহরটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় 6700 ফুট উচ্চতায় রয়েছে। এই কারণে বছরের সব সময়ই এখানে বেশ ভালো ঠান্ডা থাকে। এখান থেকে উপভোগ করা যায় কাঞ্চনজঙ্ঘার দৃশ্য এবং নানা রকম পাহাড়ি সৌন্দর্য।
কম খরচে কিভাবে দার্জিলিং যাবেন
যেহেতু এর জন্য ভারতে প্রবেশ করতে হবে তাই সবার আগে প্রয়োজন একটা পাসপোর্ট এবং ইন্ডিয়ান ভিসা।
তারপর ঢাকা থেকে কিংবা অন্য যেকোন স্থান হতে পঞ্চগড়ের বাংলাবান্ধায় এসে ইমিগ্রেশন করতে হবে। এই পথেই আপনি ট্রেনে বা বাসে অতিক্রম করতে পারেন। ট্রেনে যাতায়াত করলে খরচ একদমই কম হবে। সেখান থেকে পৌঁছাতে হবে শিলিগুড়ি জিপস্ট্যান্ডে।
তারপর শিলিগুড়ি থেকে দার্জিলিং পৌঁছানোর জন্য ট্যাক্সি বা জীপ সহ অনেক যানবাহনে পাওয়া যায়। সময় লাগবে মাত্র আড়াই ঘণ্টা। তবে বর্তমানে ঢাকা থেকে সরাসরি নিউ জলপাইগুড়ি পর্যন্ত ট্রেন রয়েছে। যারা কিনা বাজেট কমাতে চান তারা এই রাস্তাটি পছন্দ করতে পারেন।
যেহেতু এটি একটি পাহাড়ি রাস্তা তাই বমি এবং মোশন সিকনেসের জন্য প্রস্তুত থাকা প্রয়োজন। সেই সাথে অবশ্যই শীতের পোশাক এবং এসেন্সিয়াল কেয়ার সাথে করে নিয়ে যাবেন যাতে করে ঠান্ডায় কোন সমস্যা না হয়।
সিলেট ভ্রমণ গাইড ও খরচ
বাংলাদেশের অন্যতম দর্শনীয় স্থান সিলেটে ২ বা ৩ দিনের ট্রিপে সাধারণত ৪০০০ থেকে ৫ হাজার টাকা জনপ্রতি খরচ হতে পারে। আর যদি এসি বাসে যাতায়াত করতে চান তাহলে আরো এর থেকে দেড় হাজার টাকা পর্যন্ত বেশি খরচ হয়।
সিলেটে পৌঁছানোর পর প্রথম দিনে মাজার পরিদর্শন এবং ছাড়া চা বাগানে ঘুরতে যেতে পারেন। দ্বিতীয় দিনে চা বাগান, জৈন্তাপুর এবং লালখান ঘোরার জন্য ভালো জায়গা হবে। তারপর বিছানাকান্দি বা জাফলং জিরো পয়েন্ট এবং পাথর কোয়ারিও দর্শনীয় স্থান।
সিলেট ভ্রমণের জন্য সবচাইতে সেরা সময় হচ্ছে বর্ষাকাল অর্থাৎ জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর মাস। আবার কেউ যদি জাফলং এর সৌন্দর্য উপভোগ করতে চান তাদের তাহলে শীতকালেই ঘোরার জন্য সেরা জায়গা
কম টাকায় ঘোরার জায়গা
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে যে কোন স্থানে ঘুরে আসা অল্প বাজেটে সম্ভব। এর জন্য শুধুমাত্র এই আর্টিকেলের প্রথম থেকে লেখা টিপস গুলো অনুসরণ করুন। কক্সবাজার, সুন্দরবন, রাঙ্গামাটি, সাজেক, সিলেট কিংবা ঢাকার আশেপাশে যে কোন স্পটে ঘুরতে যান না কেন এর জন্য ট্রেন কিংবা পাবলিক পরিবহন সুবিধা রয়েছে। তবে কম খরচে ঘোরার জন্য অবশ্যই ছুটির দিন বের হওয়া যাবে না এতে করে খরচ বেড়ে যাবে।
ঢাকার আশেপাশে যারা রয়েছেন তারা গাজীপুরের সাফারি পার্ক, নুহাশ পল্লী ইত্যাদি স্থানে যেতে পারেন। আর যদি বাজেট একটু বেশি থাকে এবং হাতে দুই থেকে তিন দিন সময় থাকে তাহলে রাঙ্গামাটির, সাজেক, সিলেট ভালো অপশন।
অনলাইনে ট্রেনের টিকেট কাটার নিয়ম
অনলাইনে টিকিট কাটার জন্য প্রথমে বাংলাদেশের রেলওয়ে ওয়েবসাইট বা রেল সেবা অ্যাপটি ডাউনলোড করতে হবে। তারপর গ্রাহকের জন্ম নিবন্ধন বা জাতীয় পরিচয়পত্র দিয়ে রেজিস্ট্রেশন করা প্রয়োজন। রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন হয়ে গেলে ভ্রমণের স্থান তারিখ এবং স্টেশন নির্বাচন করে সার্চ বাটনে ক্লিক করতে হবে।
এরপর কাঙ্খিত দিন এবং সময় যে সকল ট্রেন আসন ফাঁকা রয়েছে সেগুলো আপনার স্ক্রিনে দেখাবে এবং সেখান থেকে নির্বাচন করতে হবে। তারপর মোবাইল ব্যাংকিং এর মাধ্যমে টাকা পরিশোধ করে কাঙ্খিত ইমেইলটি ডাউনলোড করতে পারবেন।
এখানে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে ভ্রমণের ১০ থেকে ১৫ দিন আগে অগ্রিম টিকেট কিনা ভালো। একটি জাতীয় পরিচয় পত্রের মাধ্যমে একসাথে সর্বোচ্চ চারটি পরিবারের টিকেট ক্রয় করা যায়
বাসের টিকেট বুকিং করার নিয়ম
বর্তমানে অনলাইনে বাসের টিকেট বুকিং করার জন্য বিভিন্ন ধরনের প্লাটফর্ম রয়েছে। তাছাড়া বড় বড় পরিবহন কোম্পানিরও নিজস্ব ওয়েবসাইট কিংবা প্লাটফর্ম রয়েছে যার মাধ্যমে অনলাইনের টিকিট ক্রয় করা যায়।
তবে সবচাইতে ভালো উপায় হচ্ছে প্রথমে যাত্রা পথ এবং পরিবহন কোম্পানি নির্বাচন করা। তারপর সেই পরিবহন কোম্পানির নাম্বার জোগাড় করুন। ইন্টারনেটে সার্চ করলে এখন সব তথ্যই পাওয়া যায়। নাম্বার যোগাযোগ করার পর সরাসরি সেই নাম্বারে কল দিয়ে তাদের সাথে কথা বলে বাসের টিকেট বুকিং করুন। এটি সবচাইতে নিরাপদ উপায়।
ঘুরতে যেতে সবাই পছন্দ করে। কিন্তু কাজের চাপ সংসারের ব্যস্ততা ইত্যাদি কারণে নিজের জন্য এই সময়টুকুই বের করা হয়ে ওঠে না। তারপরে বাজেটের সমস্যা তো আছে। আশা করি আপনাদের এই ব্যস্ত জীবনে কম খরচে ভ্রমণ করার উপায় এর টিপসগুলি কোথাও ঘুরতে যাওয়ার সুযোগ এনে দেবে। আপনার জন্য শুভকামনা।