গ্রাফিক্স ডিজাইন শিখে ফ্রিল্যান্সিং করাটা একটি সৃজনশীল পেশা। এটা দ্বারা মূলত ভিজুয়াল কন্টেন্ট তৈরি করা হয়। সকল ধরনের ছবি, ব্যানার, পোস্টার ডিজাইনই গ্রাফিক্সের অন্তর্ভুক্ত। তাই এর গুরুত্ব যেমন অপরিসীম এবং চাহিদা ও ব্যাপক।
প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের একটি ভিজুয়াল আইডেন্টিটি এবং প্রচারণার প্রয়োজন হয়। সেটি হতে পারে কোন লোগো, ব্যানার, প্রোডাক্টের ডিজাইন, মোড়কের ডিজাইন ইত্যাদি। এমনকি কোম্পানির ভাবমূর্তি তৈরি এবং গ্রাহকের সাথে দীর্ঘস্থায়ী সংযোগ স্থাপনেও গ্রাফিক্স ডিজাইনের ভূমিকা ব্যাপক। ডিজিটাল আইডেন্টিটি থেকে শুরু করে মার্কেটিং এমন কোন সেক্টর নেই যেখানে ডিজাইনের প্রয়োজন হয় না। এটি একদিকে যেমন প্রচারণায় দ্রুত প্রভাব ফেলে অন্যদিকে মানুষের কাছে সাথে প্রতিষ্ঠানের সংযোগ স্থাপন করেন। এখন আমি গ্রাফিক্স ডিজাইন শিখে ফ্রিল্যান্সিং করার খুঁটিনাটি বিষয় আলোচনা করব। যেহেতু এটি একটি বিস্তর প্লাটফর্ম তাই লেখাটি মনোযোগ সহকারে পড়ুন।
মোবাইল দিয়ে লোগো ডিজাইন
আপনি নিশ্চয়ই বিভিন্ন কোম্পানির একটি সুনির্দিষ্ট আইডেন্টিটি হিসেবে লোগো দেখেছেন। এটি এমন একটি আইডেন্টটিতে যেটা কিনা একটি প্রতিষ্ঠানের জন্যই বরাদ্দ থাকে। হুবহু ডিজাইনটি অন্য কেউ ব্যবহার করতে পারেনা। উদাহরণ হিসেবে আমরা ফেসবুক কিংবা youtube এর লোগোর কথা বলতে পারি। ফেসবুকের লোগোটি শুধুমাত্র মেটা প্লাটফর্ম কিংবা ফেসবুকে ব্যবহার করার অধিকার রাখে। এই ছোট্ট আইডেন্টিটিকেই লোগো বলে।
লোগো ডিজাইন করে কিভাবে ইনকাম করবেন?
যখন কোন নতুন প্রতিষ্ঠান তাদের যাত্রা শুরু করে তখন সবার আগে যে জিনিস প্রয়োজন তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে লোগো। আর এটা যেহেতু কোম্পানির সাথে আজীবন থেকে যায় তাই এটির গুরুত্ব অনেক। একটি লোগো ডিজাইনের জন্য তারা লক্ষ টাকা খরচ করতে রাজি যদি সেটা যথেষ্ট প্রফেশনাল, ইউনিক এবং সুন্দর হয়।
সাধারণভাবে বিভিন্ন ফ্রিল্যান্সিং মার্কেটপ্লেস গুলোতে একটি লোগো ডিজাইনার জন্য পাঁচ থেকে পঞ্চাশ হাজার টাকা পর্যন্ত পাওয়া যায়। আর যারা কিনা এই কাজে খুবই প্রফেশনাল তারা তো লক্ষ টাকা পর্যন্ত নিয়ে থাকে একটি লোগো ডিজাইনের জন্য।
আপনি নিশ্চয়ই এখন চিন্তা করছেন হাতে থাকা মোবাইল দিয়ে কি এটা করা সম্ভব? উত্তর হ্যাঁ।
শুধুমাত্র হাতের ছোট্ট ডিভাইসটি দিয়েই প্রফেশনাল মানের লোগো তৈরি করা সম্ভব। তবে এর জন্য বেসিক ডিজাইন সম্পর্কে কিছুটাতো লেখাপড়া করা উচিত। এ সম্পর্কিত বিভিন্ন ভিডিও আপনি ইউটিউবে পেয়ে যাবেন। তবে আমি এমন কিছু সফটওয়্যারের কথা উল্লেখ করছি যেগুলো দিয়ে মোবাইলে লোগো ডিজাইন করতে পারবেন।
Canva, Adobe Express, Logo Maker Shop, Logo Maker by Bizthug

ক্যানভা দিয়ে ডিজাইন করার নিয়ম
ক্যানভা দিয়ে সহজেই প্রফেশনাল মানের লোগো, ব্যানার সহ প্রায় সকল গ্রাফিক্সই তৈরি করা যায়। এমনকি মোবাইলে যে ক্যানভা অ্যাপ ইন্সটল করা যায় সেটাতেই এই কাজ সম্পন্ন করতে পারবেন। ডিজাইন করার নিয়ম বা ধাপসমূহ আমি সংক্ষেপে বোঝানোর চেষ্টা করছি।
• প্রথমে সফটওয়্যারটি মোবাইলে ইন্সটল করে একাউন্ট ওপেন করুন।
• অ্যাকাউন্ট ওপেন করার পর সামনে বিভিন্ন ধরনের অপশন দেখতে পারবেন। যেখান থেকে ডিজাইনের ক্যাটাগরি যেমন facebook পোস্ট, লোগো, ফ্লায়ার ইত্যাদি রয়েছে। তারপর ক্যাটাগরি সিলেক্ট করে পছন্দের একটি টেমপ্লেট বেছে নিন।
• টেমপ্লেট পছন্দ হয়ে গেলে এর ভেতরে ছবি, ফন্ট, রং ইত্যাদি বিষয় পরিবর্তন কিংবা কাস্টমাইজ করতে পারবেন।
ডিজাইনকে সুন্দর এবং আকর্ষণীয় করতে কিছু নিয়মকানুন মেনে চলতে হয়। এর জন্য অন্যের করা ডিজাইন বেশি বেশি এনালাইসিস করবেন এবং খেয়াল করবেন কালার ফন্ট ইত্যাদির বিষয়। যেকোনো ডিজাইন সুন্দর দেখানোর আরো একটি ভালো টেকনিক হচ্ছে অতিরিক্ত বা হিজিবিজি কিছু না করা। চেষ্টা করবেন ডিজাইনের অর্ধেক কিংবা তার বেশি অংশ ফাঁকা রাখার জন্য। তবে প্রয়োজন হলে আরও বেশি জায়গা ব্যবহার করতে পারেন।
গ্রাফিক্স ডিজাইন বাংলা টিউটোরিয়াল
গ্রাফিক্স ডিজাইন শিখে ফ্রিল্যান্সিং করা বেশ ধৈর্য ব্যাপার। যদি আপনি পুরোদস্তর একজন ডিজাইনার হতে চান তাহলে প্রয়োজন হবে একটি ল্যাপটপ অথবা ডেস্কটপের। আপনার মনে মনে যদি আকাঙ্ক্ষা থাকে যে একজন সফল ডিজাইনের হবেন তাহলে নিচের ধাপ গুলি অবশ্যই পার হতে হবে।
• প্রথমে প্রয়োজন হবে ল্যাপটপ ডেস্কটপ এবং ইন্টারনেট সংযোগের।
• নির্ধারণ করতে হবে আপনি কোন ধরনের ডিজাইনার হবেন। সেটি হতে পারে লোগো, ব্যানার, ওয়েবসাইট, অ্যাপ বা প্রোডাক্ট ডিজাইনার। ডিজাইনার হওয়ার জন্য প্রথমে একটি ক্যাটাগরিতে শুরু করতে হবে। পরবর্তীতে চাইলে ভিন্ন ভিন্ন ক্যাটাগরিতেও কাজ করতে পারবেন।
• এবার পছন্দের কাজটির মার্কেট এনালাইসিস করুন। কোন কোন প্ল্যাটফর্ম হতে বায়ার কিংবা ক্লায়েন্ট সংগ্রহ করতে পারবেন এবং কাজের চাহিদা কেমন তা বুঝে নিন। সেইসাথে কাজের কোয়ালিটিভ ভেদে রেট ভালোভাবে জেনে নিন। এতে করে ভবিষ্যতে হতাশ হতে হবে না।
• ক্যাটাগরি পছন্দ হলে আপনাকে সংশ্লিষ্ট সফটওয়্যার এবং ওয়েবসাইট সম্পর্কে এনালাইসিস করতে হবে। যেমন, যদি লোগো ডিজাইনার হতে চান তাহলে অবশ্যই এ্যাডোবি ইলাস্ট্রেটর অথবা এই ধরনের সফটওয়্যার গুলো সম্পর্কে জানতে হবে।
আবার ওয়েবসাইট ডিজাইনার হতে চাইলে ফিগমা অথবা এডোবি এক্স ডি সফটওয়্যারের কাজ শিখতে হবে
ছবি, ব্যানার, ফ্লায়ার ডিজাইনার হতে চাইলে এডোবি ফটোশপের কাজ শিখতে হবে।
• ইউটিউব কিংবা জনপ্রিয় কোনো প্রতিষ্ঠান হতে কোর্স করতে পারেন। যদি টাকা দিয়ে কোর্স করার সামর্থ্য না থাকে তাহলে ইউটিউবে অনেক ফ্রি টিউটোরিয়াল রয়েছে যেগুলো প্রিমিয়াম কোয়ালিটির। আমি ইউটিউব দেখেই গ্রাফিক্সের সমস্ত কাজ শিখেছি। কারণ সব ধরনের সমস্যার সমাধানে এখন youtube এ পাওয়া যায়।
• ইউটিউব দেখে কাজ শেখার পাশাপাশি নিজে নিজের প্র্যাকটিস করা শুরু করুন। যদি কোন প্রজেক্ট নিজে নিজে সম্পন্ন করতে পারেন তাহলে নিজে পোর্টফোলিও তে যুক্ত করুন। দরকার হয় কারো কাজ ফ্রিতে করে দিন। এতে করে অভিজ্ঞতা হবে।
• বিভিন্ন ফ্রিল্যান্সিং প্ল্যাটফর্মে অ্যাকাউন্ট করুন এবং প্রোফাইল সুন্দরভাবে সাজান। আপনার যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা পোর্টফোলিওতে সুন্দর ভাবে যুক্ত না করলে বায়ার ভরসা হারাবে।
• এবার বিভিন্ন প্লাটফর্মে কাজ খোঁজা শুরু করুন। মার্কেটপ্লেসের পাশাপাশি ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার এমনকি আশেপাশের পরিচিত জনদের কাছেও নিজের মার্কেটিং করুন। কারণ বর্তমান যুগে গ্রাফিক্স ডিজাইন শিখে ফ্রিল্যান্সিং করার জন্য লোকাল ক্লায়েন্টই যথেষ্ট।

ব্যানার তৈরির সহজ সফটওয়্যার
যাবে কিনা সহজে মোবাইল দিয়ে ব্যানার তৈরি করতে চান তাদের জন্য রয়েছে সহজ উপায়। আমি এমন কয়েকটি সফটওয়্যারের নাম দিচ্ছি যা দিয়ে মোবাইল অথবা পিসি উভয় মাধ্যমেই ব্যানার তৈরি করতে পারবেন।
Canva, Adobe Express, Banner Maker Flyer Ad Design, Inshot, Pixelab, Poster Maker
অনলাইনে ছবি বিক্রি করে আয়
গ্রাফিক্স ডিজাইন শিখে ফ্রিল্যান্সিং করার বিষয়টি তো বুঝেছেন। এত নিশ্চয়ই অবাক হচ্ছেন যে ছবি বিক্রি করে আয় করার উপায় কি। আসলে এটিও বর্তমান সময়ের খুব জনপ্রিয় পেশা। গ্রাফিক্স ডিজাইন এবং ছবি বিক্রি মোটামুটি একই ধরনের।
এক্ষেত্রে নিজের তৈরি বিভিন্ন ব্যানার, পোস্টার, ফ্লায়ার, লোগো বিক্রি করতে পারবেন। সেই সাথে ক্যামেরা দিয়ে তোলা ছবিও বিক্রি করা যায়। বিশ্বজুড়ে অসংখ্য প্রতিষ্ঠান রয়েছে যাদের প্রতিনিয়তই কপিরাইট সহ ছবি কেনার প্রয়োজন পড়ে। আপনার হাতে থাকা মোবাইল দিয়ে সুন্দর সুন্দর ছবি তুলে অনেক পারফর্মে সেগুলো বিক্রি করা যাবে। আপনাদের সুবিধার জন্য নিচে সেই প্ল্যাটফর্ম গুলোর নাম দিচ্ছি। এখনই সেই ওয়েবসাইটগুলো ঘুরে আসুন এবং জেনে নিন কিভাবে এবং কত দামে ছবি বিক্রি করা যায়।
Freepik, Unplash, Pexels, Vecteezy
সবশেষে, একটি কথাই বলতে চাই যে, গ্রাফিক্স ডিজাইন শিখে ফ্রিল্যান্সিং করা আপনার জন্য তখনই সহজ হবে যখন প্রতিনিয়ত কঠোর পরিশ্রম করে নিজেকে উন্নতি করতে পারবেন। এই সেক্টরে যতটা না বেশি কাজ করতে হয় তার চেয়ে বেশি নিজের প্র্যাকটিস করতে হয় এবং এনালাইসিস করতে হয়। যদি এই কঠিন পথ পাড়ি দিতে পারেন তবেই একদিন সফল হতে পারবেন। আপনার জন্য শুভকামনা।