ব্যবসার বিক্রি বাড়াতে ডিজিটাল মার্কেটিং এর সেরা ৫টি কৌশল

ঘরে বসেই মানা মানুষ এখন সারা বিশ্বের যেকোন প্রান্তের খবর রাখতে পারছে। পৃথিবীর পরিণত হয়েছে একটি গ্লোবাল ভিলেজে। আর এই সবই সম্ভব হয়েছে তথ্যপ্রযুক্তি কল্যাণে। তাই ব্যবসার বিক্রি বাড়াতে ডিজিটাল মার্কেটিংও সমানভাবে জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। একসময় মার্কেটিং করার জন্য প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা মানুষের দোড়গোড়ায় যেতো। কিন্তু এখন আর সেটির প্রয়োজন হয় না। আমাদের মোবাইল ল্যাপটপ কিংবা টেলিভিশনের স্ক্রিনে সকল ধরনের বিজ্ঞাপন দেখতে পাই। বিশ্বের প্রায় ৫৫.৮% মানুষ মোটামুটি নিয়মিত ইন্টারনেট ব্যবহার করছে। আর এদের বেশিরভাগই সোশ্যাল মিডিয়া নিয়মিত ব্যবহার করে।

তাই নিজের ব্যবসার প্রসারে ডিজিটাল মার্কেটিং এর ব্যবহার এনে দিতে পারে বৈপ্লবিক পরিবর্তন।

ডিজিটাল মার্কেটিং কি ও কেন প্রয়োজন

যে কোন পন্য বা সেবা সবার কাছে তুলে ধরার জন্য প্রয়োজন মার্কেটিংয়ের। এক সময় এই ধরনের বিজ্ঞাপন বা মার্কেটিং বলতে আমরা শুধুমাত্র রেডিও টেলিভিশন কিংবা রাস্তার পাশে বড় বড় বিলবোর্ডকে বোঝাতাম। সময় পরিবর্তনে এই কাঠামোর পরিবর্তন হয়েছে যার নতুন রূপে নামই হচ্ছে ডিজিটাল মার্কেটিং। বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যা প্রায় ২০ কোটি এবং তার ৬২ পার্সেন্ট মানুষের ইন্টারনেট ব্যবহার করে।

আর তথ্যপ্রযুক্তি কিংবা ডিজিটাল মাল্টিমিডিয়ার মাধ্যমে যেকোনো সেবার বিজ্ঞাপন বা প্রচারণা কে মানুষের হাতে পৌঁছে দেওয়ার পদ্ধতিকে এই ডিজিটাল মার্কেটিং বলে। ইলেকট্রনিক ডিভাইস বা ইন্টারনেট ব্যবহার করে যত বিজ্ঞাপন বা প্রচারণা চালানো হয় তার সবই এই মার্কেটিংএর অন্তর্ভুক্ত।

ব্যবসার বিক্রি বাড়াতে ডিজিটাল মার্কেটিং এর সেরা ৫ টি কৌশল

নিচে উল্লেখিত কৌশল গুলো ব্যবহার করে আপনার ব্যবসার আয় বৃদ্ধি করতে পারেন।

১. সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং: যেই সার্ভিস বা পূর্ণ বিক্রি করেন না কেন সেটার বিজ্ঞাপন সকল ধরনের সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে পোস্ট করুন।

২. ভিডিও মার্কেটিং: যেহেতু এখন রিলস এবং শর্ট ভিডিওর জনপ্রিয়তা বেশি তাই পূর্ণের ছোট ছোট ভিডিও তৈরি করে সেগুলো ইউটিউব, ফেসবুক এবং টিকটকে পোস্ট করুন। এতে কাস্টমারের দ্রুত মনোযোগ আকর্ষণ করে।

৩. ওয়েবসাইট: অল্প টাকা খরচ করলেই এখন সুন্দর সুন্দর ওয়েবসাইট বানানো যায়। প্রতিষ্ঠান যত ছোটই হোক না কেন একটি ওয়েবসাইট রাখুন। এতে করে কাস্টমার বেশি আকর্ষিত হয়।

৪. ইমেইল মার্কেটিং: যে সকল গ্রাহক ইতিমধ্যে পন্য ক্রয় করেছে বা সার্ভিস গ্রহণ করেছেন তাদের ইমেইল অথবা ফোন নাম্বার সংগ্রহ করুন। পরবর্তীতে বিভিন্ন ধরনের আকর্ষণীয় অফার, ডিসকাউন্ট তাদেরকে মেইল করে দিন। এতে করে একই গ্রাহক আপনার কাছ থেকে বারবার সার্ভিস গ্রহন করবে বা পণ্য ক্রয় করবে।

৫. ইনফ্লুয়েন্সার মার্কেটিং: ডিজিটাল মার্কেটিং এর একটি নতুন অংশ এটি। যে সকল ব্যক্তিদের সোশ্যাল মিডিয়া প্লাটফর্মে ভালো ফলোয়ার রয়েছে তাদের সাথে একটি চুক্তি করুন এবং আপনার পণ্যের বিজ্ঞাপন তাদের আইডিতে কিংবা প্লাটফর্মে দিন।

ফেসবুকে বিজ্ঞাপন বা বুস্ট করার নিয়ম

ডিজিটাল মার্কেটিং কি সেটা তো আমরা এখন বুঝতে পেরেছি। এবার জানবো এর বড় অংশ ফেসবুক বুস্ট করার নিয়ম সম্পর্কে। এই পদ্ধতিটির মাধ্যমে যে কোন পেইজ কিংবা আইডির বিজ্ঞাপন কে মানুষের কাছে সহজে পৌঁছে দেওয়া যায়। চলুন এর ধাপগুলো জেনে নেই।

১. প্রথমে আপনাকে পোস্ট রেডি করতে হবে। সেটি হতে পারে কোন লিখা ছবি কিংবা ভিডিও। আর ফেসবুক বিজনেস ম্যানেজার এ সকল পোষ্টের জন্য সুনির্দিষ্ট ফরম্যাট হয়েছে। মনে রাখবেন এই পোস্ট যত আকর্ষণীয় হবে আপনার বিক্রি কিংবা এনগেজমেন্টের সম্ভাবনা তত বৃদ্ধি পাবে।

২. পোস্ট করা শেষ হলে সেটির নিচে ডান পাশে বুষ্ট পোস্ট নামে একটি অপশন দেখতে পাবেন। সেই অপশনটিতে প্রবেশ করে নির্ধারিত টার্গেটেড অডিয়েন্স সিলেট করুন। এটি সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ অপশন। আসলে কোন ধরনের মানুষের কাছে আপনি পোস্টটি পৌঁছে দিতে চান তা নির্বাচন করতে হবে।

৩. এরপরে বিজ্ঞাপনের ক্যাটাগরি সহ বেশ কয়েকটি অপশন রয়েছে। এখান থেকে নির্বাচন করতে হবে আপনার পোস্টটি কতদিনের জন্য চালু থাকবে। সেই সাথে দৈনিক কত টাকা খরচ করতে পারবেন এই বিজ্ঞাপনের জন্য।

৪. সকল সকল প্রয়োজনীয় তথ্যগুলো দেওয়ার পর টাকা পরিশোধ করতে হবে এবং তারপর পাবলিশ বাটনে চাপ দিন।

সবকিছু ঠিক থাকলে বিজ্ঞাপনটি ১০ মিনিট থেকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে চালু হয়ে যাবে। এভাবেই যে কেউ সহজেই ফেসবুকে পেজ বুষ্ট করতে পারবেন।

আর ও পড়ুনঃ-বাংলা ব্লগ সাইট বানিয়ে গুগল থেকে আয়ের উপায়

অনলাইনে ব্যবসার আইডিয়া

ইন্টারনেটে বিজ্ঞাপন দেওয়া যেমন সহজ ঠিক তেমনিভাবে ব্যবসা করাও অনেক সহজ। কারণ ব্যবসার জন্য প্রয়োজন প্রচারণা। অনলাইনে ব্যবসার আইডিয়া তো অনেকেই আছে। তার মধ্যে সবচাইতে সহজ ৩ টি ব্যবসার আইডিয়া শেয়ার করব।

১. ড্রপ শিপিং

এই বিজনেসটি পুরোটাই অনলাইনের নির্ভর। অর্থাৎ এর জন্য বাহ্যিক কোন আয়োজনের প্রয়োজন নেই। বিশ্বের যে কোন জায়গা হতে পন্য ক্রয় করে সেটি amazon এ সেল করার পদ্ধতিটি ড্রপ শিপিং নামে পরিচিত। এর জন্য নির্বাচন করতে হবে সঠিক একটি পূর্ণ এবং সেটি ক্রয় করে amazon এ বিক্রির জন্য লিস্টিং করতে হবে।

ধরুন চায়নাতে এমন একটি পণ্য পাওয়া যায় যেটির চাহিদা ইন্ডিয়াতে রয়েছে। অনলাইনেই আপনি সেই পণ্যটি অর্ডার করবেন এবং ইন্ডিয়াতে শিপিং করবেন। তারপর অ্যামাজন ওয়েবসাইটে সে পণ্যটির বিস্তারিত যুক্ত করে ইন্ডিয়ার মানুষের কাছে বিক্রি করবেন। এই পদ্ধতিটিতে প্রচুর টাকা উপার্জন করা যায় যদি আপনি সঠিক কোনটি বাছাই করতে পারেন। আর যেহেতু ঘরে বসেই সম্পূর্ণ কাজটি করা যায় তাই অনেক ফ্রিল্যান্সাররা এই কাজের প্রতি ঝুঁকছেন।

২. সোশ্যাল মিডিয়া ম্যানেজমেন্ট

যারা কিনা বেশ জনপ্রিয় সেলিব্রেটি এবং ইনফ্লুয়েন্সার তাদের অনেক ধরনের অ্যাকাউন্ট থাকে পরিচালনার জন্য। এ ব্যাপারে দক্ষ কেউ চাইলেই অনলাইনে এই সার্ভিসটি বিক্রি করতে পারেন। যার মাধ্যমে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান কিংবা সেলিব্রেটিদের ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম বা ইউটিউব চ্যানেল পরিচালনা করা এবং মার্কেটিং সহ অনানা ধরনের সেবা প্রদান করা। বর্তমানে এটির বেশ জনপ্রিয়তা রয়েছে এবং ভবিষ্যতে আরো জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পাবে।

৩. অনলাইন কোর্স ও কোচিং

কারো যদি বিশেষ কোনো দক্ষতা থাকে যেমন ভাষা শিক্ষা, প্রোগ্রামিং, রান্না করা বই লেখা বা যে কোন পণ্য তৈরি করার অভিজ্ঞতা তাহলে সে সহজেই অনলাইনে কোর্স ও কোচিং চালু করতে পারে। যেদিকে সহজ ভাষায় ই লার্নিং প্ল্যাটফর্ম বলা যায়। এর মাধ্যমে দেশজুড়ে হাজার হাজার শিক্ষার্থী থেকে পাঠদানের মাধ্যমে বেশ ভালো আয় করা যায়।

অনলাইনে ব্যবসার আইডিয়া গুলোর মধ্যে সবচাইতে সেরা ৩ টি আপনাদের সাথে শেয়ার করলাম। এবং যাদের ফ্রিল্যান্সিং সম্পর্কে আগ্রহ রয়েছে তারা যে কেউ এই তিনটি একটি পছন্দ করে আগে শুরু করে দিতে পারেন।

সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং টিউটোরিয়াল

সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং হল ফেইসবুক, ইনস্টাগ্রাম, লিংকডইনের মত মাধ্যম ব্যবহার করে যে কোন ব্র্যান্ড বা পণ্যের প্রচারণা চালানো। এর মাধ্যমে সচেতনতা বৃদ্ধি করা যায় এবং অন্যটি সঠিক কাস্টমারের কাছে পৌঁছে দেওয়া যায়।

সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং টিউটোরিয়ালের মূল ধাপসমূহ হলো :

১. লক্ষ্য নির্ধারণ: কি ধরনের প্রচারণার চান তা নির্ধারণ করতে হবে। কাস্টমারের কাছে সরাসরি পণ্য বিক্রি করবেন নাকি কোন পন্য সম্পর্কে জানাবেন তা নির্ধারণ করুন।

২. বিজ্ঞাপনের জন্য সঠিক প্ল্যাটফর্ম নির্বাচন করুন। যেমন ফেসবুকে তরুণ-তরুণীদের কে পাওয়া যায় আবার প্রফেশনালদে কাছে বিজ্ঞাপন করার জন্য লিংকডটিন ভালো অপশন।

৩. আকর্ষণীয় কন্টেন্ট তৈরি: যেকোনো পোস্ট ছবি কিংবা ভিডিও তৈরি করার আগে সেটা সম্পর্কে ভালোভাবে গবেষণা করে নিন। মানুষ এখন অযথা বড় ভিডিও কিংবা বড় লিখা পড়তে পছন্দ করে না।

৪. বিজ্ঞাপনের সময় নির্ধারণ করে সেটি পাবলিশ করুন।

পরবর্তীতে আপনার বিজ্ঞাপনটি কেমন পারফর্ম করছে অর্থাৎ এর পরের সংখ্যা নিয়মিত এনালাইসিস করুন। যেকোনো ধরনের অসঙ্গতি লক্ষ্য করলে কৌশল পরিবর্তন করুন। বর্তমানে ইউটিউবে বিভিন্ন ধরনের টিউটোরিয়াল রয়েছে যার মাধ্যমে ফ্রিতেই আপনি সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং সম্পর্কে খুঁটিনাটিয়ে জানতে পারবেন। এ ব্যাপারে কোন সাহায্যের প্রয়োজন হলে আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন।

এসইও শেখার গাইডলাইন

ডিজিটাল মার্কেটিং এর একটি পার্ট হচ্ছে এসইও। এর সম্পূর্ণ রূপ হচ্ছে সার্চ ইঞ্জিন অপটিমাইজেশন। যেকোনো তথ্য জানার জন্য আমরা সেটি google এ সার্চ করি। তারপর গুগল আমাদেরকে সংশ্লিষ্ট উত্তর আছে এমন কোন সাইট প্রদর্শন করে। আর যেই পদ্ধতিতে এটাই সেই কাঙ্খিত সাইটটি গুগল আমাদেরকে সামনে নিয়ে আসে সেই পদ্ধতিটিকে বলা হয় এসইও বা সার্চ ইঞ্জিন অপটিমাইজেশন। এটি শুধুমাত্র গুগল ও নয় বরং অন্যান্য সার্চ ইঞ্জিনের ক্ষেত্রে একই ভাবে প্রযোজ্য।

• এসিও শিখার জন্য সর্বপ্রথম জানতে হবে ক্রাউলিং, ইনডেক্সিং এবং রেংকিং কি। অর্থাৎ কোন একটি সাইট কিংবা প্ল্যাটফর্মকে ইউটিউব গুগল কিংবা অন্যান্য সার্চ ইন্জিনের সাথে যুক্ত করে সেই পদ্ধতি।

• এসইও শিখার গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হচ্ছে কিওয়ার্ড রিসার্চ। আপনাকে বুঝতে হবে একজন ব্যবহারকারী তথ্য খোঁজার ক্ষেত্রে কোন ধরনের শব্দ করে ব্যবহার করে। আপনি যদি কন্টেন্টে এমন কোন শব্দ ব্যবহার করেন যেগুলো দিয়ে কেউ সার্চ করে না তাহলে সেই পোস্ট কিংবা তথ্যটি কখনোই সার্চ ইঞ্জিনের ব্যবহারকারীকে দেখাবেনা।

• তারপর শিখতে হবে অনপেইজ এসিও। এর মাধ্যমে টাইটেল, ট্যাগ, ডিসক্রিপশন, হেডার ট্যাগ, ইউআরল স্ট্রাকচার ইত্যাদি যুক্ত করা হয়।

• উপরের ধাপগুলো সেটা হয়ে গেলে বিভিন্ন টেকনিক্যাল পার্ট যেমন ওয়েবসাইট লোডিং, স্পিড, সাইট ম্যাপ, ইনডেক্সিং সমস্যার সমাধান করা ইত্যাদি বিষয় সম্পর্কে জানতে হবে।

বর্তমানে যেহেতু সব জায়গায় এআই টুলস ব্যবহার করা হচ্ছে তাই গুগল অ্যানালাইটিসের মতো টুলস ব্যবহার করে কিভাবে এটা টপিকেশন করা হয় তা প্র্যাকটিস করতে হবে। এই এসইও শেখার জন্য সবচাইতে ভালো পদ্ধতি হচ্ছে নিজের একটি ওয়েবসাইট বা প্লাটফর্ম তৈরি করে নাও। বাস্তব অভিজ্ঞতা হবে এবং কাজও শিখতে পারবেন খুব দ্রুত।

অতীতেও ডিজিটাল মার্কেটিং এর বেশ ভালো চাহিদা ছিল এবং দিন দিন এর চাহিদা বৃদ্ধি পাচ্ছে। কারণ সবাই এখন ইলেকট্রনিক ডিভাইস ব্যবহার করে। এর মাধ্যমে ব্যবহারকারীর কাছে সঠিক পণ্য পৌঁছে দেওয়া খুবই সহজ এবং যেকোনো প্রদর্শনের বিক্রির সম্ভাবনাও বৃদ্ধি পায়। এমনকি অনেকেই নিয়মিত চাকরি ছেড়ে ডিজিটাল মার্কেটিংকে পুরোপুরি ভাবে পেশা হিসেবে বেছে নিচ্ছে এবং মাসে লক্ষ টাকা আয় করছে। বাংলাদেশে বসেই সারা পৃথিবীতে এই সার্ভিস প্রদান করা যায়। তাই কেরিয়ার হিসেবে এটিকে পছন্দ করা অবশ্যই ভালো সিদ্ধান্ত হবে।

মন্তব্য করুন