বর্তমানে পৃথিবীতে প্রায় সবকিছুই প্রযুক্তি নির্ভর। যেকোনো ব্র্যান্ড কিংবা পণ্যের প্রচারণা করার জন্য এখন সবচাইতে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয় অনলাইন কিংবা ডিজিটাল প্লাটফর্মকে। আর তারই হাত ধরে অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিং করে ইনকাম করার পন্থাগুলো আরো বেশি জনপ্রিয় হচ্ছে। এফিলিয়েট মার্কেটিং করে অর্থ উপার্জনের শূন্য থেকে শেষ পর্যন্ত স্টেপ বাই স্টেপ গাইড আজকে আলোচনা করব। তাই পুরো আর্টিকেল জুড়ে আমাদের সাথেই থাকুন।
অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিং বাংলা গাইড
শুরুতে আপনাকে জানতে হবে আসলে অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিং কি। সহহ ভাষায় এটি ডিজিটাল মার্কেটিং এর একটি অংশ। ছোট ছোট উদ্যোক্তা কিংবা খুচরা বিক্রেতারা বড় বড় ওয়েবসাইট কিংবা মার্কেটারদের কাছ থেকে সাহায্য নেয় নিজেদের পণ্য বিক্রয় করার জন্য। একটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে।
ধরা যাক আপনার একটি ইউটিউব চ্যানেল কিংবা ফেসবুক পেইজ রয়েছে। লক্ষ লক্ষ মানুষ সেই চ্যানেল কিংবা পেজকে ফলো করে এবং আপনার কনটেন্ট তারা নিয়মিত দেখে। তাহলে আপনার মাধ্যমে শেয়ার করা একটি তথ্য লক্ষ লক্ষ মানুষ দেখতে পারে এবং সেটার সাথে যুক্ত হতে পারে।
এখন আমি একজন আম বিক্রেতা। আপনার চ্যানেল কিংবা পেইজে আমার আম কিংবা অন্য কোন পণ্যের বিজ্ঞাপন দিলে সেগুলো মানুষ দেখতে পারবে এবং ক্রয় করতে পারবে। বিনিময়ে আমি আপনাকে নির্দিষ্ট চুক্তির ভিত্তিতে এই মার্কেটিং এর জন্য অর্থ প্রদান করব। আর এই পদ্ধতিটা একেই বলা হয় অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিং। অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিং করে টাকা ইনকাম বর্তমান যুগের অন্যতম একটি ফ্রিল্যান্সিং প্ল্যাটফর্ম।

Amazon অ্যাফিলিয়েট আয় বাংলাদেশ
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অনেক এক্সপার্টরা অ্যামাজন এফিলিয়ে করে লক্ষ লক্ষ টাকা উপার্জন করতে করছে। তবে এই ধরনের আন্তর্জাতিক প্লাটফর্ম গুলোতে কাজ করার জন্য প্রয়োজন যথাযথ অভিজ্ঞতা এবং প্রশিক্ষণ। তা না হলে শুধুমাত্র কাজ শুরু করলে যে টাকা উপার্জন হবে বিষয়টি এমন নয়।
নিশ্চয়ই জানেন যে অ্যামাজন হচ্ছে পৃথিবীর অন্যতম সেরা একটি ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম। সারা বিশ্বজুড়ে হাজার হাজার ক্যাটাগরির লক্ষ লক্ষ পণ্য বিক্রি করা হয়। এমনকি বিশ্বের বিভিন্ন দেশেতেও এই সকল পণ্যগুলি ক্রয় করা যায়। অ্যামাজনের যে সেলার বা বিক্রেতারা থাকে তাদের সাথে চুক্তি মাধ্যমে তাদের পন্যের মার্কেটিং করে ইনকাম করতে পারেন প্রচুর অর্থ। এফেলিয়ে মার্কেটদের জন্য অ্যামাজনও রেখেছে বিশেষ ব্যবস্থা। এতে করে সরাসরি বিক্রেতার সাথে আপনার কোন যোগাযোগ করতে হবে না। বরং একজন এফিলিয়েট মার্কেটার হিসেবে একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করেই আপনি শুরু করতে পারেন আয় করা।
Affiliate link দিয়ে আয়
অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিং করে ইনকাম করার জন্য আপনাকে সবার আগে বুঝতে হবে এফিলিয়েট এড্রেস বা লিংক কি। এটি হচ্ছে এমন একটি এড্রেস যে এড্রেসটিতে প্রবেশ করলে সরাসরি পণ্য ক্রয় করার পেইজে বা অপশনে কোনো গ্রাহকে নিয়ে যাওয়া হয়।
ধরা যাক মিস্টার রহিম অ্যামাজনে টেলিভিশন বিক্রি করে। যদি আমি মিস্টার রহিমের টেলিভিশন বিক্রি মার্কেটিং করে কমিশন পেতে চাই তাহলে, বিক্রেতা আমাকে একটি ইউনিক এড্রেস বা লিংক তৈরি করে দেবে। আর সেই অ্যাড্রেসের মাধ্যমে যতো কাস্টমার তার ওয়েবসাইটে কিংবা ই-কমার্স সাইটে প্রবেশ করে টেলিভিশন ক্রয় করবে তার উপর আমি একটি কমিশন বা অর্থ পাব। অর্থাৎ সেই এড্রেসটি শুধু আমার এফিলিয়েটের জন্যই বরাদ্দ থাকবে।
এফিলিয়েট মার্কেটেররা সাধারণত এই এড্রেস তাদের ফেসবুক, ইউটিউব, ইনস্টাগ্রাম, ওয়েবসাইট ইত্যাদি প্ল্যাটফর্মে প্রচার করে। তারপর সেখান থেকে যত মানুষ পণ্যটি ক্রয় করে তার উপর সে অর্থ উপার্জন করতে পারে।
বিষয়টি সত্যি দারুন না? আপনাকে নির্দিষ্ট কোন কাজ করতে হচ্ছেন না। বরং আপনার পরিচিতি দিয়েই অ্যাফিলিয়েট করে আয় করতে পারবেন অর্থ।
নতুনদের জন্য অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিং
যারা কিনা ডিজিটাল পারফর্মে নতুন তাদের জন্য এই মার্কেটিং আইডিয়াটি হতে পারে খুবই সহজ এবং সেরা। কারণ আমি দেখেছি খুব সহজেই কেউ সোশ্যাল মিডিয়ার প্লাটফর্ম গুলোতে সহজেই জনপ্রিয় হতে পারে। যদি কেউ ট্রাভেল করতে পছন্দ করে তাহলে ট্রাভেল ব্লগ চ্যানেল তৈরি করলে সেখানে সহজেই লক্ষ লক্ষ সাবস্ক্রাইবার কিংবা ভিজিটর আনা যায়। এরকম চ্যানেল বাংলাদেশে অনেক রয়েছে।
ফেসবুকে লেখালেখি পছন্দ করে এমন কারো পেইজেও দেখা যায় বেশ ফলোয়ার রয়েছে। অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিং করে টাকা ইনকাম করার জন্য শুধুমাত্র এই ফলোয়ার এবং ভিজিটরি যথেষ্ট। তারপর তাদের কাছে যে কোন বিক্রেতার পণ্যের বিজ্ঞাপন করে টাকা ইনকাম করা যায়। আবার অনেকে নিজের পণ্য ও বিজ্ঞাপন করতে পারে এই অডিয়েন্সদের কাছে।
ওয়েবসাইট ছাড়া অধিভুক্ত আয়
অনেকেই আবার বলে থাকে ওয়েবসাইট ছাড়া নাকি এই ধরনের অর্থ উপার্জনই সম্ভব না। তাদের কথায় একদমই কান দিবেন না। টিকটক ফেসবুক ইনস্টাগ্রাম এমনকি টেলিগ্রাম চ্যানেলেও অ্যাফিলিয়েট করা সম্ভব। এর জন্য থাকতে হবে ধৈর্য, চেষ্টা এবং অধ্যবসায়। আপনার কি নেই সেটা না চিন্তা করে কি আছে সেটা চিন্তা করুন। অনেকে তো রীতিমতো ইমেইলের মাধ্যমে পন্যের বিজ্ঞাপন করা শুরু করে দেয়। বিভিন্ন গ্রাহকদের ইমেইল এড্রেস সংগ্রহ করে এবং পণ্যের প্রচারণা বা বিজ্ঞাপন ইমেইল করে। বিশ্বাস না হলেও একটু সময় এই ইমেইল মার্কেটিংটাই সবচাইতে বেশি জনপ্রিয় ছিল। বর্তমানে সোশ্যাল মিডিয়ার প্লাটফর্মের যুগে এটা তো আরো বেশি সহজ হয়েছে।

অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিং করে ইনকাম করার ১৩ টি সেরা উপায়
আমাদের সমাজে মার্কেটিং এর কঠিন এবং চ্যালেঞ্জিং বলে বিবেচনা করা হয়। বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তি সেই ধারণাটিকে পাল্টে দিয়েছে। কারণ ঘরে বসে একটি ল্যাপটপ মোবাইল কিংবা ইন্টারনেট সংযোগের মাধ্যমে যে কোন পণ্যের প্রচারণা সারা বিশ্বজুড়ে চালানো যায়। আর সেখানে রয়েছে শত শত কোটি গ্রাহক। তাই কেন আমরা এই বিশাল সুযোগটাকে হাতছাড়া করবো। চলুন জেনে নেই এমন ১৩ টি সেরা আইডিয়া যার মাধ্যমে আপনি খুব সহজেই এফিলেট করতে পারবেন।
১। সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং
বর্তমান শতাব্দীর সবচাইতে শক্তিশালী বিষয় হচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম গুলি। যেখানে facebook ইন্টারনেট ইত্যাদি প্লাটফর্মে আলোচনার মাধ্যমে দেশের বড় বড় পরিবর্তন হচ্ছে সেখানে অ্যাফিলেট মার্কেটিং করা তো খুবই সহজ বিষয়। আপনার হাতে যেহেতু ইন্টারনেট রয়েছে তাই নিশ্চয়ই আপনার টুইটার, ইনস্টাগ্রাম বা ফেসবুক অ্যাকাউন্টও রয়েছে। তাই আজই শুরু করে দিন নিজের অ্যাফিলিয়েট প্রোগ্রাম।
২। ওয়েবসাইট অ্যাফিলিয়েট
ওয়ার্ডপ্রেস কিংবা ব্লগার দিয়ে খুব অল্প টাকাই নিজের একটি ওয়েবসাইট তৈরি করা যায়। তারপর সেখানে নিজের পছন্দের লেখাগুলি প্রকাশ করতে থাকুন। নিয়মিত ভিজিটর আসলে তা দিয়ে শুরু করতে পারবেন এফিলিয়াট।
৩। Youtube
পৃথিবীর সবচাইতে বড় ভিডিও স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম হচ্ছে ইউটিউব। আর এখানে চ্যানেল খোলা এবং ভিডিও আপলোড দেওয়া একদম ফ্রি। বিশ্বজুড়ে শতশত কন্টেন্ট ক্রিয়েটর এধরনের প্লাটফর্ম থেকে লক্ষ টাকা ইনকাম করছে। নতুন নতুন আইডিয়ায় কিংবা নিজের সৃজনশীলতা প্রমাণ করার জন্য ইউটিউব সেরা জায়গা।
৪। ইমেইল মার্কেটিং
যদিও বর্তমানে এই প্লাটফর্ম থেকে অনেকেই এড়িয়ে চলেন তবুও এটি অনেক শক্তিশালী মার্কেটিংয়ের জন্য। কারণ এতে করে গ্রাহক যখন খুশি তখন আপনার বিজ্ঞাপন টি দেখতে পারে। ইউরোপের দেশগুলোতে এই পদ্ধতিতে এখনো প্রচুর মার্কেটিং করা হয়।
৫। শর্ট ভিডিও
লং ভিডিওর চাইতে মানুষ রিলস এবং শর্ট ভিডিও বেশি দেখে। তাই অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিং করে টাকা ইনকাম করার মাধ্যমগুলোর মধ্যে এটিও হতে পারে সেরা। বিউটি, প্রোডাক্ট, হেলথ সাপ্লিমেন্ট ইত্যাদি বিষয়ে শর্ট ভিডিও গ্রাহকদের বেশি আকর্ষণ করে।
৬। ই-কমার্স সাইট
Amazon এর মত বাংলাদেশে বসে আপনি দারাজ অ্যাফিলিয়েট করতে পারবেন। নাম, ঠিকানা ইত্যাদি প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে দারাজের সেলার একাউন্ট ওপেন করে পণ্যের প্রচারণা চালানো যায়। যেহেতু বাংলাদেশের এটি অন্যতম একটি বড় ই কমার্স সাইড তাই এখান থেকে অর্থ উপার্জনের সুযোগ রয়েছে।
৭। Facebook গ্রুপ
আমরা তো পেইজ এবং চ্যানেলের কথা জানি। কিন্তু ফেসবুক গ্রুপ পরিচালনা করেও ঠিক একই পদ্ধতিতে ডিজিটাল মার্কেটিং বা এফিলেট মার্কেটিং করা যায়। এমন অনেক সাধারন ফেসবুক গ্রুপ রয়েছে যেখানে মিলিয়ন মেম্বার থাকে। আপনিও এরকম একটি গ্রুপ পরিচালনা করে সেখানে অ্যাফিলেট করতে পারবেন।
৭। পিন্টারেস্ট
এটি একটি ভিজুয়াল সার্চ ইঞ্জিন। এখানে বিভিন্ন পণ্যের সুন্দর সুন্দর ছবি কিংবা ইনফোগ্রাফিক করে সরাসরি এফিলিয়েট এড্রেস যুক্ত করে ট্রাফিক পাঠানো যায়। এমন আরো একটি প্ল্যাটফর্ম হচ্ছে কুয়োরা।
৮। অনলাইন কোর্স ও ই-বুক
আপনার যদি নির্দিষ্ট কোন বিষয়ে দক্ষ থাকে তাহলে সেই বিষয়ে অনলাইন কোর্স চালু করতে পারেন অথবা ই-বুক লিখে পিডিএফ আকারে বিক্রি করতে পারেন। আবার সেই ই বুকিং বা পিডিএফ এর ভেতরে এফিলিয়েট এড্রেস যুক্ত করে দিয়ে মার্কেটিং করা যায়।
৯। পডকাস্ট
বর্তমানে ফেসবুক ও ইউটিউবে পডকাস্ট বেশ জনপ্রিয়। ব্রডকাস্ট চলাকালীন সময়ে ডেসক্রিপশনে বিভিন্ন পণ্যের কুপন, ডিসকাউন্ট কিংবা এড্রেস যুক্ত করে শেয়ার করা যায়।
১০। পেইড অ্যাডস
ফেসবুক, গুগল, লিংকডইন সহ প্রায় সকল প্লাটফর্মে টাকা দিয়ে বিজ্ঞাপন চালানো যায়। আর এই উপায়টি ব্যবহার করা যায় ডিজিটাল মার্কেটিং বা এফিলিয়েট করে টাকা ইনকামের ক্ষেত্রে। এতে করে কোন একটি পণ্য নির্দিষ্ট গ্রাহকদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার সুবিধাও রয়েছে। তবে এর জন্য অভিজ্ঞতা প্রয়োজন। তা না হলে লোকশান হতে পারে।
আমাদের শেষ কথা
আর্থিক সচ্ছলতার জন্য এফিলিয়েট মার্কেটিং করে টাকা ইনকাম বেশ বড় একটি সুযোগ। তবে শুধুমাত্র চমকপ্রদর বিজ্ঞাপন কিংবা মোটিভেশন ভিডিও দেখেই কাজে নামা উচিত নয়। হাতে যথেষ্ট সময় নিয়ে আগে গবেষণা করতে হবে এবং পুরো সিস্টেমটি কিভাবে কাজ করে সেটি জানতে হবে। বিশেষ করে অ্যাফিলেট প্ল্যাটফর্ম থেকে কিভাবে ব্যাংক কিংবা পেওনিয়ারের মত আন্তর্জাতিক মাধ্যম টাকা উত্তোলন করতে হয় সে প্রক্রিয়া। অনেকেই এই অংশটিকে এড়িয়ে যান কিংবা কম গুরুত্ব দেন। কিন্তু আমার কাছে এই পার্ট টুকু সবচাইতে বেশি গুরুত্ব বহন করে। তাই সংশ্লিষ্ট সব অংশই সুন্দর ভাবে বোঝার পর কাজ শুরু করাই সবচেয়ে নিরাপদ। আপনার সফলতার জন্য শুভকামনা।